Subscribe:

মধ্যরাতের শ্বেতপরী ( গল্প লেখা প্রতিযোগিতা, গল্প নং-৭)

সেদিন রবিবার ছিল। সাপ্তাহিক ছুটির দিন। এক বড় ভাইয়ের বাসায় দাওয়াত ছিল। তার নিজের কোল্ড স্টোরেজ আছে, টমেটো দিয়ে দেশি মাছ, সালাদ আর খাশি ভুনা ছিল মেন্যু। আবার খেলাম হাতে মাখিয়ে। বিদেশ বিভুয়ে হাত দিয়ে খাবার সুযোগ পাওয়া যায় খুব কম। রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিদায় নিলাম, একটা হিসাব মনে কষে রেখছিলাম,মেট্রো স্টেশনে পৌছাতে ১০ মিনিট, ট্রেনের জন্য ৫ মিনিট আর ইমারজেঞ্ছি আরও ১৫ মিনিট। সব মিলিয়ে শেষ ট্রেন আমার মিস করার কথা না। মেট্রো আবার রাত ১২ টা ২০ মিনিটে বন্ধ হয়ে যায়।


রাস্তায় নেমে আমি হেলে দুলে হাটতে লাগলাম,বেশ ঠাণ্ডা দেখে মাথায় টুপি আর ওভার কোটের বোতাম সাঁটলাম। রবি ঠাকুরের তুমি রবে নিরবে গানের প্রথম কয়েকটা কলি সমানে ভাজতে লাগলাম। ট্রেন এ উঠে অগাথা ক্রিস্টির একটা বই খুলে বসলাম। আমার প্রথম জীবনের প্রেম এই অগাথা।মিনিট সাতেক পর আমার স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। সেখান থেকে আমার হোস্টেল ১২ মিনিটের হাটা পথ। বিদেশের বোকা গুলোকে রিক্সা কনসেপ্টটা শরবত করে গুলে খাইয়ে দেয়া উচিত। ট্রেন থেকে নেমে আমি এস্কালেটরে উঠলাম। পাতাল থেকে উপরে উঠতে এই বৈদুতিক সিঁড়ির আয়োজন। যখন উঠছি তখন আমার কয়েকধাপ উপরে একটা মেয়েকে দাঁড়ানো দেখলাম। উস্ক খুস্ক চুল আমার প্রথমে চোখে পড়ল। এক হাতে রেলিং ধরে হেলে আছে ,একটু লক্ষ্য করতেই দেখলাম পা কাপছে ওর। সিঁড়ি যখন চলন্ত এই পা কাপা খুব ভয়ঙ্কর। আমি কয়েকটা সিঁড়ি পেড়িয়ে ওর পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। মৃদু কান্নার শব্দ পেলাম।এবং ঠিক সেই মুহূর্তে ওকে বড্ড ঠুনকো মনে হল,আমি পেছন থেকে ওর পিঠে হাত ঠেকালাম।এবং প্রায় সাথে সাথেই ও ওর শরীরের ভর আমার হাতের উপর ছেড়ে দিল। আমি দুই হাতে ওর কাধ ধরে ওকে ঠেকিয়ে রাখলাম। ও আস্তে করে বলল “স্পাসিবা” যার অর্থ ধন্যবাদ। মেট্রো স্টেশনে সর্বক্ষণ পুলিশ প্রহরা থাকে, আমি তাকে পুলিশের কাছে যেতে বললাম।ওর কান্নার বেগ বেড়ে গেল এবং সে আমাকে বলল কারো কাছে যাবার মত মানসিক অবস্থা তার নেই। এই কথা বলার সময় সে আমার দিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল,আমি প্রচণ্ড এলকোহলের গন্ধ পেলাম,দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে আমার দেরি হল না। বুঝলাম প্রচণ্ড বিপদে আছে সে,এই মধ্যরাতে মাতাল অবস্থায় কাউকে পেলে পুলিশ খুব জ্বালাতন করে। তিলকে তাল বানিয়ে লিখিত অভিযোগ পত্রে সাক্ষর করতে বাধ্য করে, দীর্ঘক্ষণ স্টেশনে জেরা করে ইত্যাদি। একজন মানুষ হিসেবে ওকে এই মধ্যরাতে আমার সেখানে ফেলতে ইচ্ছে হল না। ততক্ষণে আমরা উপরে চলে এসেছি,পুলিশও দেখতে পেলাম, ওকে হাতে ধরে আমি এক্সিট এর দিকে হাটতে থাকি। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করল না। ভালয় ভালয় আমরা বাইরে বের হয়ে আসলাম। বের হবার সাথে সাথে ওর বমি শুরু হল। আমি টিস্যু বের করে দিলাম।ও উদ্ভ্রান্তের মত আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। আর কাদতে লাগলো।– তুমি কোথায় থাকো?-জানি না- আমাকে ঠিকানা বল, আমি ট্যাক্সি ডেকে দেই।- আমি জানি না, আমি বমি করার জন্য ট্রেন ছেড়েছি।- তোমার কি নাম?- আমার নাম লারিসা- এখন কি করবে?- আমাকে সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ,তুমি যেতে পারো- সাবধানে বাড়ি ফিরতে পারবে?- সেটা আমি বুঝবো।এর পর আর কথা থাকতে পারে না। আমি উলটা ঘুরে হাটা শুরু করলাম। একটু যেতেই আমাকে সে গলা উচু করে ডাকল।- কি?– আমাকে এক বোতল পানি কিনে দিতে পারবে? আমি এখানের দোকান চিনি না।- দোকান এখান থেকে বেশ দূরে, হাটতে হবে,পারবে? ও মাথা ঝাকালো।আমরা হাটতে লাগলাম ,জানুয়ারি মাসের উত্তাল হাওয়া, সেই সাথে তুষারপাত। ওর খোলা চুলে তুষার আটকে যেতে লাগল,পরক্ষনে বাতাসের ঝাপে সেই তুষার আবার উড়ে যেতে লাগলো। ওর সাথে একটা স্কুল ব্যাগ,আমি আমাকে দিতে বললাম, কারন ওর এখন হালকা হওয়া দরকার,সেই সাথে খুব স্বাভাবিক ভাবে নিঃশ্বাস নেয়া প্রয়োজন।আমি ওকে বাইরে দাড়াতে বলে দোকানের ভেতরে ঢুকলাম, ঝটপট একটা পানির বোতল আর এক ছোট বোতল লবন কিনে বেড়িয়ে আসলাম। এসে দেখি দোকানের পাশে ও বসে পড়েছে, চোখ বন্ধ, ওর শাদা জ্যাকেট তুষারে আরও শ্বেত হয়েছে। রোম্যান্টিক কিছু ভাবার মত মানসিকতা ছিল না, তবু একটা উপমা মনে এসেছিলা, শ্বেতপরী। আমি ওর পাশে গিয়ে বসলাম, চিকিৎসা বিজ্ঞানে পড়ি, তাই জানি ওর এ অবস্থায় অনেক বেশি রিলাক্স করা দরকার,সেই সাথে জ্যাকেট খুলে দিতে পারলে ওর আরও অনেক বেশি ভালো লাগতো।কিন্তু সম্ভব নয়,প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় নিউমোনিয়া কিম্বা ব্রঙ্কিওসাইটিস হয়ে যেতে পারে।-পানি এনেছি, কেমন লাগছে?-কি?-আমি পানি কিনে এনেছি।- কত রুবেল?( রাশিয়ান মুদ্রা)- পরে দিও,এখন পানি নাও।বোতল খুলে ও বেশ কিছু পানি পান করল। আমার হাতে বোতল ধরিয়ে দিল। আমি টিস্যুতে পানি ভিজিয়ে ওর মুখ মুছিয়ে দিলাম,- তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।- তুমি স্বাগতম- তোমার পাসপোর্ট অথবা আইডি কার্ডটা দেখতে পারি? তোমার ঠিকানা জানা দরকার।ও আমাকে ওর ব্যাগের দিকে ইশারা করল,আমি খুলে আইডি কার্ড আর ফোন পেলাম। দেখলাম পানি বিদ্যুৎ বিভাগের ছাত্রী, দ্বিতীয় বর্ষের। ঠিকানা যা লেখা সেই জায়গা আমি চিনি না।- তোমার কাছে ফোন আছে? তোমার বাবা-মা কে ফোন করতে চাই.- আমি অন্য শহর থেকে এসেছি। ফোনে আমার রুমমেট এর নাম্বার আছে-আচ্ছা দাও দেখিআমি ওর রুমমেট কে ফোন করলাম, কয়েকবার রিং হবার পর ধরল,সব খুলে বললাম। আমি বললাম আমি জরুরি মেডিকেল সার্ভিস এ ফোন করতে যাচ্ছি ,এবং তার নাম্বার আমি সেখানে দিয়ে দেব। এরপর আমি মেডিকেল সার্ভিস ফোন করলাম,নিজদের অবস্থান জানালাম, তারা আমাকে জানালো ২০ মিনিট পর এখানে উপস্থিত থাকবে।- শোন একটা কাজ করতে হবে-কি কাজ,আমি কিছু পারবো না- আমি পানিতে লবন মিশিয়ে দিচ্ছি,খেয়ে বমি করতে হবে,পারবে?-জানিনাআমি পানিতে লবন মিশিয়ে ওকে দিলাম,খেতে বললাম, ও ভয় ভয় চোখে আমার দিকে তাকাল। আমি ওকে আশ্বস্ত করলাম। ও পানি গিলল কিন্তু বমির নাম গন্ধ নেই, আমি ওকে গলায় আঙ্গুল দিতে বললাম, এবারে হল। বমির পর অনেকটা স্বাভাবিক হল ও। একটা চুইংগাম দিলাম ওকে চাবাতে। নোনা মুখের স্বাদ দূর করতে।মিনিট ১৫ পর এম্বুলেঞ্চ আসলো। তারা ওকে তুলে নিয়ে গেল। আমাকে ক্লিনিকের ঠিকানা ফিয়ে গেল। এর মধ্যে আমার দিকে একবারও ফিরে তাকাল না লারিসা। যেন সব ওর অজানা,অপরিচিত। সাই করে চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল গাড়ি।

আমি হোস্টেলে ফিরলাম।পরদিন ক্লাস শেষ হল বিকাল ৩ টায়। আমি ক্লিনিকে যাবার কথা চিন্তা করলাম,আবার ভাবি কেন? কি দরকার, মানুষ হিসাবে যতটুকু করার দরকার আমি করেছি। বাকিটা ও বুঝুক। ও যাবার আগে আমাকে একবার ধন্যবাদ ও দিল না। কি দরকার।কোথা থেকে একরাশ নিরাশা আমাকে এসে চেপে ধরল। কিন্তু ভেতর থেকে তখন ওকে আর একবার অনেক দেখতে ইচ্ছা করছে। খুব বেশি । সাত পাচ না ভেবে রাস্তায় নামলাম, ফুলের দোকান থেকে ৩ টা গোলাপ কিনলাম।কারন জোড় সংখ্যক ফুল কাউকে দেয়া মানে তার মৃত্যু কামনা করা, আর এক প্যাকেট চকলেট।পৌঁছে দেখি বিকাল ৪টা। ভিজিটিং আওয়ার শেষ। আমি ফুল আর চকলেট হাতে দাড়িয়ে রইলাম। গোলাপের পাপড়িতে শাদা তুষার জমে অনেকটা দুধে আলতা আবহ তৈরি করেছে। সাহস করে ভেতরে ঢুকলাম। হেড নার্স কে সব খুলে বললাম। নার্স বলল আমরা আপনার কথা জানি, ভেতরে যান, ১৫ মিনিট পাবেন, অফ দা ডকুমেন্ট। চকলেট এখানে ছেড়ে যান, লারিসা যাবার সময় কাউন্টার থেকে নিয়ে যাবে। ক্লিনিকে বাইরের খাবার নিষিদ্ধ। ভেতরে গেলাম। দেখি লারিসা বিছানায় হেলান দিয়ে পত্রিকার শব্দজট মিলাচ্ছে।-হাই- আসো, আমি জানতাম তুমি আসবে।- কিভাবে জানতে?- এমনিতেই ,মেয়েরা অনেক কিছু যানে। আমাকে কেউ কখনও গোলাপ দেয়নি।- আচ্ছা,কাল অন্য ফুল নিয়ে আসব।- না,আমার জন্য এনেছ আমাকে দাও।আমি ফুল ওর হাতে দিলাম, তখনও ফুলের উপরে কিছু তুষার। হাত দিয়ে নাড়া চাড়া করলে লাগলো লারিসা।- কি নাম তোমার?- আমার নাম মীম।- মীম নামের রাশিয়ান অর্থ জানো?-জানি- ফুলের কি নাম দেয়া যায়?- ইচ্ছা হলেই দেয়া যায়।- একটা গোলাপ মিম, একটা লারিসা, আর একটা………-কি?- বলব না-কেন?-ইচ্ছা তাই।- তোমার জন্য এক প্যাকেট চকলেট এনেছিলাম, কাউন্টারে আটকে দিয়েছে,পরে নিয়ে নিও- তুমি কোন দেশের- আমি বাংলাদেশের।- তাহলে অন্য ফুলটার নাম বাংলাদেশ।আমি বিছানার পাশে বসলাম। ওর সাথে কথা বলতে লাগলাম, ও সহসা আমার হাত চেপে ধরল, ভেজা গলায় বলল,ধন্যবাদ দেব না, যদি অনেক বিরক্ত করে থাকি রাতে,মাফ করে দিও। আমি বুঝলাম গতরাতের বিষণ্ণতা এখন ওকে আবার চেপে ধরবে,এটা মনস্তত্ত্ব।বিষয়বস্তু খুব দ্রুত বদলানো দরকার। আমি ওর আঙ্গুল নাড়তে লাগলাম।-বাহ খুব সুন্দর নেইল পলিশ-বেগুনি রঙ পছন্দ করো?-খুব বেশি না ,কিন্তু তোমার নখে অদ্ভুত লাগছে।- তুলে দেবে একটু? আজ রাতে আবার দেব। ব্যাগের মধ্যে স্পিরিট আর তুলো আছে।আমি আস্তে আস্তে স্পিরিটে তুলো ভিজিয়ে ওর নেইল পলিশ তুলতে লাগলাম ,এই কাজটা আমি আগে কখনই করিনি।আর ওর গল্প শুনতে লাগলাম।-আবার কবে আসবে?- জানিনা- আসলে আমার ভালো লাগবে।-আমারও ভালো লাগবে।মুখ ফস্কে কথা বেড়িয়ে গেল।আমি ভীষণ লজ্জা পেলাম,ও আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। সময় খুব দ্রুত বয়। ১৫ মিনিট পার হয়ে তখন ২০ মিনিট।আমি বেড়িয়ে আসলাম, একবুক প্রশান্তি নিয়ে। মনের মধ্যে তখন অনেক রঙ খেলা করছে আমার।এরপর বহুদিন পেড়িয়ে গেল। আমি এখনও মাঝে মাঝে ওর নেইল পলিশ তুলে দেই, আর ও হাসে, এই কাজটা এখন ভালই রপ্ত করেছি। আর এর পর থেকে ওর নখে আমি বেগুনি ছাড়া আর কোন রঙ দেখিনি।ও কোনদিন আমাকে বলেনি অই রাতে ওর কি হয়েছিল, কেন ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলো? থাকনা কিছু কিছু কথা কফিনবদ্ধ। সবার কিছুটা নিজের জায়গা থাকা খুব প্রয়োজন। 



এর কিছুদিন পর আমাকে ও খাটি বাংলা হরফে একটা মেসেজ পাঠায় ” আমি বাংলাদেশ থেকে আপনার সঙ্গে যেতে চাও” এই মেসেজ পড়ার আমার গুগল বাংলা অনুবাদককে ইচ্ছে মত মারতে ইচ্ছে হয়েছিল। কারন ও অনুবাদ করেছিল ” i wanna go to Bangladesh with you”


-Taosif Hamim

2 comments: