Subscribe:

এখানে পৃথিবী নেই (একুশের বিশেষ লেখা-৩)

চাঁদটা অর্ধেক দেখা যাচ্ছে। বাকিটা মেঘের ফাঁক গলে ঢুকে পরেছে অনেক্ষণ হল। কেমন যেন হলদে একটা রঙ চাঁদটার গায়ে। একটু আগে সন্ধ্যা নেমেছে- বোধ হয় সে জন্যই এ রকম হলদে দেখাচ্ছে। সৈকত একটা নিঃশ্বাস ফেলে নৌকার ছইয়ের ভেতর থেকে বাহিরে তাকাল। হলুদ চাঁদটা নদীর ওপর অদ্ভূত ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। নৌকাটা চলার সাথে সাথে মনে হচ্ছে চাঁদটাও সঙ্গে চলছে। ওপরে এক খন্ড আর নদীতে আরেক খন্ড।


ওর পায়ের কাছে এসে পড়েছে চাঁদের আলোটা। নিজের অজান্তেই পা দুটো আরেকটু বাড়িয়ে দিল আলোতে। ছইয়ের গায়ে হেলান দিয়ে আপন মনে পায়ের নখ গুলোর দিকে তাকালো। কয়েকটা নখ ভেঙ্গে উঠে গেছে। কালো হয়ে আছে ঐ জায়গা গুলো। বাকি নখ গুলো বেড়ে গিয়ে এমন দেখাচ্ছে যেন জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসেছে মাত্র। কাঁদা লেগে আছে।

ছইয়ের ভেতরে অন্ধকারে আরো কয়েকজন মানুষ বসে আছে ওর পাশে। চেনে না কাউকে। মূর্তির মত বসে রয়েছে সবাই। কথা বলছে না। এক দৃষ্টিতে বাহিরের দিকে তাকিয়ে আছে। জ্বলজ্বল করছে চোখ গুলো।

সৈকত আস্তে আস্তে বলল, “নোয়া পাড়ার কেউ আছেন নাকি?” নিজের কাছে নিজের কন্ঠটাই কেমন বেখাপ্পা শোনালো। গত ষোল ঘন্টা ধরে কোনো কথা বলেনি। হঠাৎ করে কথা বলায় কন্ঠটা নিজের কাছেই অপরিচিত লাগল।

জবাব দিল না কেউ। বোধ হয় নোয়া পাড়ার কেউ নেই। মাঝির দাঁড় টানার ছল ছলাৎ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। ছইয়ের ভেতরে মাথা ঝুঁকিয়ে বসে থাকতে থাকতে ঘাড় ব্যথা করা শুরু করেছে। সৈকত ছইয়ের বাহিরে বেরিয়ে এলো। নৌকার পাটাতনে পা রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। চাঁদটা ঠিক মাথার ওপর এসে দাঁড়িয়েছে। মুখ তুলে ওপরের দিকে তাকাল। মেঘ গুলো নড়ছে না, স্থির হয়ে চাঁদটাকে অর্ধেক ঢেকে দিয়ে চুপচাপ ঝুলে আছে। নদীর চারপাশ থেকে হাল্কা কুয়াশা উড়ছে। শীত শীত লাগছে। গায়ে পাতলা সুতি চেক শার্ট আর পুরনো কালো প্যান্ট। গত ন’মাসে ঠিক ক’বার এগুলো খুলেছে- হাতে গুণে বলে দিতে পারবে। মুখে হাত বুলালো। দাঁড়ি গোঁফের জঙ্গল হয়ে আছে। বাড়ি গেলে বোধ হয় কেউ চিনতে পারবে না। আদৌ চেনার মত কেউ বেঁচে আছে কিনা- তাও জানে না ও। ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলল। হামিদ ভাই শেষ বার যখন গ্রাম থেকে এসেছিল- সেবার নাকি পুরো গ্রামটা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিয়েছিল মিলিটারী বাহিনী। যারা বেঁচে ছিল সবাই বর্ডার পেরিয়ে ভারতে চলে গেছে। কেউ থাকার কথা না। এত তাড়াতাড়িও কেউ ফিরবে না। মাত্র দু’দিন হল দেশ স্বাধীন হয়েছে। এখনো ছেঁড়া ছেঁড়া ভাবে এখানে সেখানে যুদ্ধ চলছে। দেশ যে স্বাধীন হয়েছে অনেকেই জানে না।

চাঁদের আলোয় আবছা ভাবে নোয়া পাড়া গ্রামটার অবয়ব চোখে পরছে। স্থির হয়ে আছে যেন অন্ধকারের মাঝে পুরো গ্রামটা। জীবনের কোনো চিহ্ন নেই। মাঝি এক মনে দাঁড় বাইছে। নিঃশব্দে নৌকাটা ঘাটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে চারপাশ। ঘাটের বিশাল বট গাছটা ঠিক আগের মতই নদীর দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে। শীতকাল বলে পাতা অল্প ঝড়েছে। লতা গুলো ঠিক আগের মতই নদীর ওপর ঝুলছে, ইতস্ততঃ বাতাসে এদিক ওদিক দুলছে। হঠাৎ করে গাছটার দিকে তাকালে মনে হয় কোনো ঋষি-সন্ন্যাসীর ঝাঁকড়া মাথার চুল। নদীর দিকে মুখ ঝুঁকিয়ে তিনি গভীর ভাবে চিন্তা মগ্ন হয়ে কিছু ভাবছেন।

ঘাটে ভীড়তেই সৈকত লাফিয়ে নেমে গেল নৌকা থেকে। মাঝি কোনো কথা না বলে দাঁড় ঠেলে আবার নৌকা নদীতে নামিয়ে নিল, বাইতে লাগল সামনের দিকে। নদীর এখনে শেষ নেই। পা ভিজছে সৈকতের। নৌকাটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ছোট হয়ে আসছে দ্রুত নৌকাটা। নদীর ওপর চাঁদের প্রতিবিম্বটা এখন আর নৌকার সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে না। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেন সৈকত এই ঘাটে নেমে গেছে বলে প্রতিবিম্বটাও ওর সঙ্গে সঙ্গে এখানে নেমে গেছে। যায়নি।

সৈকত এখন নৌকাটা দেখছে না আর, চাঁদের প্রতিবিম্বটার দিকে তাকিয়ে আছে। এখনো হলুদ লাগছে। ওর বাবা সুব্রত কুমার সাহেব এরকম চাঁদ দেখলেই সৈকত আর ওর ছোট বোন সুনেত্রাকে ডেকে বলতেন, “দেখেছিস? আজকের চাঁদটার জন্ডিস হয়েছে। কেমন হলুদ হলুদ দেখাচ্ছে বেচারাকে! ডাবের পানি খাওয়ানো দরকার ভদ্রলোককে।”

দীর্ঘ একটা মুহূর্ত স্থির হয়ে পানিতে দাঁড়িয়ে বইল সৈকত। প্যান্টের পা ভিজে যাচ্ছে। ঘুরে হাটতে লাগল।

নদীর ধারের রাস্তাটা আগের মতই আছে। বদলায়নি। দু পাশের ঝোপঝাড় বেড়েছে কেবল। অনেক দিন চুল না কাঁটলে যেমন দেখায়, তেমন লাগছে ঝোপ গুলো। গাছ পালা রাস্তাটাকে ঢেকে রেখেছে যেমনটা দেখে গিয়েছিল শেষ বার। চাঁদের আলো এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সৈকত খালি পায়ে ধূলো মাখা পথটা ধরে হাটছে বাড়ির দিকে। এখনো পর্যন্ত কোনো আলো চোখে পরছে না। সমস্ত গ্রামটা ঘুমিয়ে আছে যেন গভীর ঘুমে।

আর একটা বাঁক পেরুলেই সৈকতদের দো’তলা কাঠের বাড়িটা। রাস্তার মোড়ের দিক থেকে গরু গাড়ির চাকার আর্তনাদ শোনা গেল। সেদিকে তাকাল ও। হারিকেন ঝুলছে গরু গাড়ির একপাশে। রোগা পটকা দুটো গরু কোনো মতে টেনে নিয়াসছে গাড়িটা। চাকার ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে রাতের নীরবতা খান খান করে ভেঙ্গে পড়ছে। সামনের দিকে বসে থাকা লোকটাকে ঠিক চেনা যাচ্ছে না অন্ধকারে। আরেকটু কাছাকাছি হতেই চেনা গেল। গফুর চাচা। অনেক শুঁকিয়ে গেছেন এ ক’মাসেই। সৈকত এক পাশে সরে দাঁড়াতেই গরু গাড়ি থামিয়ে ফেললেন,
“ক্যাডা? কুন বাড়ির পোলা তুমি? আগে তো দেখি নাই।”
সৈকত আড়ষ্ঠ গলায় বলল, “চাচা আমি, সৈকত। মাষ্টার সাহেবের ছেলে।”
খুব অবাক হলেন গফুর চাচা, “তুমি বাইঁচা আছো বাজান! আমি তো ভাবছিলাম সবাই গেছে তোমাগো বাড়ির.... কই ছিলা এদ্দিন?”
শুঁকনো কন্ঠে বলল, “যুদ্ধে। মুক্তি বাহিনীতে ছিলাম।”
চুপ হয়ে গেলেন তিনি। কয়েক মুহূর্ত পর আপন মনেই বললেন, “কই যাবা? ভিটা বাড়ি তো সব পুড়ায় দিয়া গেছে কুত্তার বাচ্চা গুলান। একটা হিন্দু বাড়িও রাখে নাই। আহারে! মানুষ গুলারে কেমনে মারলো........ একটুও মায়া হইল না..... এত টুকুন তোমার বইনডা- তারেও পর্যন্ত কুত্তা গুলা বখস দিল না!”
সৈকত নিচু স্বরে বলল, “সবাই কি পুঁড়ে মারা গেছে?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা ঝাঁকালেন নীরবে।

সৈকত কোনো কথা না বলে হাটতে লাগল বাড়ির দিকে। পেছন থেকে গফুর চাচা আহত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর আবার চালানো শুরু করলেন গরু গাড়িটা। চাকার একটানা ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ তুলে হারিয়ে গেলেন বাঁকের আড়ালে।


সৈকতদের বাড়িটার উঠান জুড়ে পোঁড়া কাঠের স্তুপ আর ফার্ণের ঝোপ। তুলসি গাছটার চিহ্নই নেই, কেবল ছোট পিলারের মত সিমেন্টে বাঁধানো তুলসির মঞ্চটা আছে। চুনের সাদা রঙ আর নেই। কালো হয়ে আছে, শ্যাওলা ধরেছে জায়গায় জায়গায়। বাড়িটার দিকে শূণ্য দৃষ্টিতে তাকালো ও। চেনার উপায় নেই আর। বাড়িটা পুঁড়ে একেবারে শেষ হয়ে গেছে। কেবল কাঠামোটাই দাঁড়িয়ে রয়েছে কোনো মতে। বারান্দা, দেয়াল, দরজা- কিছুই অবশিষ্ট নেই। চাঁদের আলোতে নীরবে অসহায় মুখে বাড়িটা তাকিয়ে আছে ওর দিকে। সৈকত আস্তে আস্তে হেটে সিঁড়ির কাছে এসে দাঁড়ালো। কালো হয়ে থাকা একটা থাম ধরে ধীরে ধীরে বসে পড়ল সিঁড়ির ওপর। হেলান দিলো সিঁড়ির ধাপ গুলোয়। চোখ বুজে এল আপন আপনি।

কান পাতলেই বাড়ির ফাঁক ফোঁকড় দিয়ে শোঁ শোঁ শব্দে ছুটে বেড়ানো বাতাসের সঙ্গে মিশে থাকা ওর বোনটার হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছে।

“দাদা, পুকুর ঘাটে যাবি? ভর দুপুরে আমার একলা যেতে ভয় লাগে। বরই পাড়বো। যাবি?”

বুক ভরে শ্বাস নিলো। পোঁড়া কাঠের গন্ধের মাঝে কোথায় যেন মার শাড়ির মিষ্টি ঘ্রাণ মিশে আছে। টের পাচ্ছে ও। আস্তে আস্তে পাশ ঘুরল। সিঁড়ির ধাপ গুলোয় বাবার পায়ের ছাপ কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে। আধো অন্ধকারে খুঁজে পেলো না সৈকত।

কেমন যেন অস্থির লাগছে। সিঁড়ি থেকে নেমে পোঁড়া কাঠের মেঝেতে শুয়ে পড়ল চিত হয়ে।  কিন্তু থাকতে পারছে না কেন জানি। উপুর হয়ে শুয়ে থাকল। শার্ট প্যান্টে কায়লার কালি আর শুঁকনো ছাই লেগে যাচ্ছে। সেদিকে ভ্রুঁক্ষেপ নেই ওর। খুব ধীরে ধীরে একেকটা মুহূর্ত কাটতে লাগল। বাড়িটায় সময় যেন দম আটকে থেমে রয়েছে। সৈকত আবার চিত হল। চোখ বন্ধ করে কান পাতল আবার।

“সৈকত? আমার হুকোয় মুখ দিয়েছিস হারামজাদা! এই বয়সে হুকো টানিস! চাবকে পাছার ছাল তুলে ফেলবো!!”  বাবার গলা শুনতে পেলো। হুকোটা কোথায়? অন্ধকারের মাঝে এদিক ওদিক তাকালো সৈকত। দেখতে পেলো না।

আবার চোখ বন্ধ করল। অস্থির লাগাটা বাড়ছে ক্রমশ। ছটফট করতে লাগল সৈকত। মায়ের গলাটা কেন জানি শুনতে পাচ্ছে না। বিড়বিড় করে কেবল বলল, “মা, শার্টের বোতাম ছিঁড়ে গেছে। তুমি সেলাই করে দেবে বলে আমি গত ন’টা মাস বোতাম লাগাইনি। একটু সেলাই করে দেবে?”

জবাব এলো না।

সৈকত শুয়ে শুয়ে মেঝেতে পা ঘষছে অস্থির ভঙ্গিতে। এমন লাগছে কেন?


হঠাৎ ওর মুখের ওপর টর্চের আলো এসে পড়ল। চোখ মেলে হাত দিয়ে আড়াল করল মুখ, “কে?” উঠে বসল।
বিস্মিত একটা কন্ঠ শোনা গেল, “সৈকত! তুই বাঁচে আছিস!” বয়ষ্ক একটা কন্ঠস্বর। চেনা চেনা লাগল সৈকতের। কিন্তু মনে করতে পারলো না কে?
টর্চ নিভে গেল। লোকটা প্রায় পাগলের মত এসে সৈকতকে জড়িয়ে ধরল, “আল্লাহ! আমি তো বিশ্বাস করতে পারতেছি না!”
হঠাৎ চিনতে পারলো লোকটাকে। ইমাম হুজুর। সৈকতের বাবার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু উনি। পাশের বাড়িটা তাদেরই। ন’মাস আগেও এ বাড়ি ও বাড়ি মিলে একটা সংসার ছিল।
সৈকত খুব সাবধানে দু হাতে জড়িয়ে ধরল ইমাম হুজুরকে। অস্থিরতা বাড়ছেই ওর।

 

মাদুর বিছিয়ে হারিকেনের ম্লান আলোতে খেতে বসেছে সৈকত। গরম ধোঁইয়া ওঠা ভাতে আঙ্গুল ডুবিয়ে খাচ্ছে। মাছের পেটিটা আগেই খেয়ে ফেলেছে। এখন মুরগীর মাংস দিয়ে ভাত মাখিয়ে খাচ্ছে।

সালেহা বেগম সামনে বসে আছেন। আঁচল দিয়ে মুখ ধরে রেখেছেন। চোখ দিয়ে অনবরত পানি গড়াচ্ছে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে। সৈকত নীরবে পেয়াজ-মরিচের ভর্তাটা টেনে নিলো। এ বাড়িতে এলেই এই ভর্তাটা সব সময় বানিয়ে দিতে হয় সালেহা বেগমকে। ছোট বেলা থেকেই সৈকতের খুব প্রিয়। সৈকতের ধারণা সালেহা বেগমের থেকে ভাল করে আর কেউ এই ভর্তা বানাতে পারবে না, এমন কি ওর মা-ও না।

সৈকত গো-গ্রাসে খেয়ে যাচ্ছে। দুবার ভাত নিলো। ইমাম সাহেব ওর পাশে বসে নীরবে ওর ওর খাওয়া দেখছেন। হারিকেনের আলোয় চিকচিক করছে তাঁর চোখ।
সৈকত মুখ ঝুঁকিয়ে খেয়ে যাচ্ছে, কোনো দিকে তাকাচ্ছে না।
দরজার পাল্লা ধরে খুব রোগা, ফ্যাকাসে একটা মেয়ে এসে দাঁড়ালো। শাড়ি পরনে। ইমাম সাহেবের মেয়ে পারুল। সৈকতের বোন সুনেত্রার সঙ্গে স্কুলে পড়তো। সৈকত মুখ তুলে একবার ওর দিকে তাকিয়ে আবার খেতে লাগল।
পারুলের বড় বড় চোখ দুটো ভরে যাচ্ছে পানিতে।
সালেহা বেগম কান্না ভেজা গলায় বললেন, “আরেকটু ভাত দেই বাবা?”
মাথা নাড়ল সৈকত, “নাহ, পেট ভরে গেছে খালা।” হাত ধুতে লাগল।
আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন, “তোমার আব্বা-আম্মা, বোন- কাউকেই বাঁচাইতে পারলাম না..... গ্রামে ক্যাম্প হওয়ার পরে মিলিটারী গুলা খালি কম বয়সী মেয়ে গুলারে ধরে নিয়া যাইতেছিল-  এই জন্য সুনেত্রারে এই বাড়িতে আনে পারুলের সাথে সিলিং এর উপর লুকায় রাখছিলাম। কিন্তু আল্লায় যে কার মরণ কই রাখছে কে জানবে? তোমাদের বাড়িতে আগুণ দিতেই মেয়েটা পাগলের মতন সিলিং থেকে নামে ছুটে গেল......” আঁচল দিয়ে চোখ ঢেকে ফেললেন আবার।

পারুল আস্তে আস্তে বলল, “সৈকত দা’ সুনেত্রা তোমার হারমোনিয়ামটা প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে পুকুরে ডুবিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল তুমি আসলে যেন পাও। বাড়ি ঘর কখন পুড়িঁয়ে দিয়ে যায় আবার.....” বাস্পরূদ্ধ হয়ে এলো ওর কন্ঠস্বর।
সৈকত গ্লাস থেকে ঢক ঢক করে সব টুকু পানি খেয়ে ফেলল। ক্লান্ত লাগছে ওর। ঘুম পাচ্ছে।
ইমাম সাহেব এতক্ষণে কথা বললেন, “চল, তোর শোয়ার ঘর দেখায় দি।”
সৈকত উঠে দাঁড়ালো।

 

গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল পারুলের। দো তলার ঘরটার জানালাটা দিয়ে চাঁদের আলো আসছে। কেন ঘুম ভাঙলো বুঝতে পারলো না। উঠে বসল। কান পেতে শোনার চেষ্টা করল কিসের শব্দে ঘুম ভেঙ্গেছে ওর। কোঁদালের হাল্কা কোঁপানোর শব্দ পাচ্ছে।

উঠে জানালার কাছে এলো। শিক ধরে এদিক ওদিক তাকাতেই থমকে গেল।

বাড়ির পেছন দিকে পুকুর ঘাট। বড় একটা বরই গাছ ঘাটের ওপর বাঁকা হয়ে ঝুলে আছে। যতটা দেখা যায়- পুকুরের পানি শুঁকিয়ে গেছে। তার মাঝে কোঁদাল হাতে নেমেছে সৈকত। পুকুরের কাঁদা কোঁপাচ্ছে! যন্ত্রের মত একটানা চারপাশে কুঁপিয়ে যাচ্ছে। চাঁদের আলোতেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ঘেমে নেয়ে গেছে ও। পাগলের মত কোঁদাল দিয়ে পুকুরের সবটা কুঁপিয়ে ফেলেছে এই মাঝ রাতে।

পারুল সরে আসল জানালার কাছ থেকে। কান্না পাচ্ছে ওর। ভয়ংকর কান্না।


সৈকত অপ্রকৃতস্থের মত কোঁদাল দিয়ে কুঁপিয়ে যাচ্ছে পুকুরের কাঁদা। শক্ত একটা কিছুতে হঠাৎ কোঁদালের ফলা লাগল। সঙ্গে সঙ্গে কোঁদাল ফেলে হাত দিয়ে টেনে কাঁদা সরাতে শুরু করল। প্লাস্টিকে প্যাঁচান চার কোনা হারমোনিয়ামটা চিনতে কোনো কষ্ট হল না। টেনে ওঠালো ভারী হয়ে যাওয়া হারমোনিয়ামটা। ঘাটের দিকে হাটতে লাগলো ওটা নিয়ে। বরই গাছটার নিচে এসে ঘাটের সিঁড়িতে পা ছড়িয়ে বসল। প্লাস্টিকটা টেনে ছিঁড়ে ফেলল হারমোনিয়ামটার। পানি ঢোকেনি ভেতরে। শুঁকনোই আছে। কাঁদা মাখা হাত প্যান্টে মুছে কাঁপা হাতে ছুঁয়ে দেখলো হারমোনিয়ামটা। ও ম্যাট্রিক পরীক্ষায় স্ট্যান্ড করার পর কিনে দিয়েছিল বাবা। গান গাওয়ার খুব শখ ছিল সৈকতের। সে জন্যই হারমোনিয়াম কেনা। নিজে নিজে গান লিখে সুর করতে পারতো। সুনেত্রার খুব পছন্দ ছিল হারমোনিয়ামটা। প্রায়ই এটা নিয়ে বসে পরতো। সৈকতের জিনিস ও ধরেছে- এ নিয়ে অনেক ঝগড়া হত দু ভাই বোনে। মা এসে মিটমাট করে দিতেন।

সৈকত হারমোনিয়ামের ঢাকনাটা খুলল। অবাক হয়ে দেখল ওর স্মরলিপি রাখার জায়গায় একটা খাম রাখা। তুলে হাতে নিল। বড় বড় করে লেখা “সৈকত দাদাকে – সুনেত্রা”।

মুখ খুলতেই একটা ছোট চিঠি বের হল। চাঁদের আলোয় সাধারণত পড়া যায় না। কিন্তু সৈকত পড়তে পারছে চিঠিটা। খুব কষ্ট করে দেখতে হয়ঃ


“দাদা,

        বাড়ি ঘর পুঁড়িয়ে দিলে তোর অত সাধের হারমোনিয়ামটাও যাবে। তাই প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে পুকুরে রেখে গেলাম। অন্য কোথাও না রেখে পুকুরে কেন রাখলাম জানিস? কারণ ছোট বেলায় তুই আমার হাড়ি পাতিল গুলো পলিথিনে ভরে এখানে ফেলতি, আর ডুব সাঁতার দিয়ে আমাকে ওগুলো তুলে আনতে হতো। যা এবার তোর হারমোনিয়ামটা দিলাম ফেলে। তোল গিয়ে। আমাকে না জানিয়ে যুদ্ধে গেলি ক্যান?

তুই যাবার কিছুদিন পর থেকে আমি পারুলদের বাড়িতে আছি। ওদের দো’তলার সিলিং এর ওপর লুকিয়ে থাকতে হয় আমাদের দুজনকে। অনেক মজা এখানে জানিস? সারা দিন রাত গল্প করি আর বই পড়ি। লুকিয়ে থাকায় খুব মজা তাই নারে? জানিস সিলিং এ থাকতে থাকতে একটা দু লাইনের গান লিখে ফেলেছি। তুই এলে সুর করবি।

 

                              “একটা মাটির পৃথিবী গড়ে দাও,

                      যদি ফের তোমরা আমায় দেখতে আবার চাও.....”

 

দূর! দাদা আমি তোর মত পারি না কেন রে? তুই এত সুন্দর করে লিখিস কীভাবে?

আর হ্যা, তোকে না জানিয়ে তোর জন্য একটা মেয়ে ঠিক করেছি। তুই বাড়ি এলেই আমি টুক করে তোদের বিয়ে দিয়ে দিবো! বড়রা যা বলে বলুকগে!

আর লেখবো না, কলম তুলে রাখলাম। তাড়াতাড়ি ফিরে আয়। আমার খারাপ লাগে অনেক। তোকে ছাড়া কখনো এতদিন থাকিনি তো।

                                                                                                        -      সুনেত্রা। ”

 


পারুল আবার জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়েছে। সৈকত ঘাটের সিঁড়িতে শুয়ে আছে পা ছড়িয়ে। হারমোনিয়ামটা পাশে। কাঁদছে না ছেলেটা একটুও। আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে চুপচাপ। চাঁদের আলোতে অন্যরকম লাগছে ওকে। পুরো দৃশ্যটার মাঝে কোথায় যেন ভয়াবহ রকমের একটা কষ্ট লুকিয়ে আছে। ধরতে পারছে না পারুল। কেবল ঠোঁট কাঁমড়ে কান্না ঠেকানোর চেষ্টা করছে ও।

সৈকতের অস্থির লাগছে। চিত হয়ে শুয়ে থাকতে ভাল লাগছে না। উপুর হয়ে শুলো সিঁড়ির ধাপ গুলোয়। অস্থিরতা বাড়ছে..... ছটফট করতে শুরু করেছে কেন জানি। বুঝতে পারছে না..... চিত হয়ে গেল আবার, বুকের ওপর খুব ভারী কিছু একটা চেপে বসেছে লাগছে ওর। পা ঘষা শুরু করেছে ঘাটের সিঁড়িতে। বিড়বিড় করে সুর করার চেষ্টা করছে সুনেত্রার লেখা লাইন দুটো-

 

                              “একটা মাটির পৃথিবী গড়ে দাও,

                      যদি ফের তোমরা আমায় দেখতে আবার চাও.....”

 

কাঁপছে সৈকত অস্থির ভঙ্গিতে। হিস্টিরিয়া রুগীর মত করছে। বারবার উপুর হয়ে সিঁড়ি খাঁমচে ধরছে, আবার চিত হয়ে যাচ্ছে.... পা ঘষছে সিঁড়িতে..... ছটফট করছে পাগলের মত.....

পারুল বরই গাছটার নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। সৈকতের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

ছেলেটা এখনো বিড়বিড় করে সুর করার চেষ্টা করে যাচ্ছে লাইন গুলো-

 

                           “একটা মাটির পৃথিবী গড়ে দাও......”

 

পারুলের দম বন্ধ হয়ে আসছে কেন জানি। আকাশের দিকে তাকাল, ঝাপসা হয়ে এলো দৃষ্টি। চাঁদের আলোতে বরই গাছ আর পুকুর ঘাট ভেসে যাচ্ছে। সৈকত এখনো অস্থির ভঙ্গিতে পা ছুড়ছে ঘাটের ওপর।

পারুল হঠাৎ খুব সাহসের কাজ করে ফেলল। ছুটে গিয়ে সৈকতের একটা হাত ধরে বসে পড়ল ওর পাশে। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, “সৈকত ভাই, আপনি কাঁদতে পারছেন না? কাঁদছেন না কেন?”

সৈকত অস্ফূট স্বরে বলল, “এখানে পৃথিবী নেই..... একটা মাটির পৃথিবী গড়ে দেবে? আমার বোনটাকে একটু দেখতে পেতাম.....”

পারুল কিছু বলতে পারলো না। কেবল শক্ত করে ওর হাতটা ধরে রাখল। সৈকতের অস্থিরতা বাড়ছে ক্রমশ..... চিত হয়ে পা ঘষছে সিঁড়িতে..... এত অস্থির লাগছে কেন ওর?

 

লেখকঃ মোঃ ফরহাদ চৌধুরী শিহাব।

1 comment: