Subscribe:

ভেটকি মাছ আর কানা বেড়ালের শুভ বিবাহ (২)

''আফা,হেই ব্যাটা এমনে শু কইরা উপর থেইক্কা লাফ দিল কেমনে? হে কি বান্দর নাকি?''
জেসমিনের প্রশ্নের আমি কি জবাব দিব বুঝতে পারলাম না। টোয়াইলাইট দেখছিলাম খুব মনোযোগ দিয়ে। [আজকাল আমি একশান মুভি বাদ দিয়ে ভালবাসায় পরিপূর্ণ মুভি দেখতে বেশী উৎসাহ বোধ করছি। প্রেম ভালবাসা জিনিসটা বড়ই ছোঁয়াচে,এসব দেখে আমার চোখ জলে টলটল করে!]


তো ক্লাইম্যাক্স এর মারামারি দেখে জেসমিনের এই প্রশ্ন। ওকে কোন কথা বলতেই ভয় লাগে। কয়েকদিন আগেই একটা সিনেমার ভিলেন দেখিয়ে বলেছিল
''আফা, আশিক ভাইজান একদম এই গুন্ডা লোকডার মত হাসে না?'' সেদিন আবার সামনে আশিকও ছিল। তবে  আশিক ওর চেয়ে এক কাঠি সরস।
''জেসমিন,তুমি ভুল বলেছ। আমি ভিলেনটার মত না,ভিলেনটাই আমাকে নকল করে। টানা এক সপ্তাহ আমার সাথে প্র্যাকটিস করার পরও দেখো অতটা ভাল ভাবে নকল করতে পারেনি''
জেসমিনের মা আমাদের বাসায় ছুটা কাজ করে। ব্যাক্তিগত কারনে তাকে গ্রামের বাড়িতে যেতে হয়েছে। কিন্তু মেয়েকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না বলে আমাদের বাসায় রেখে গেছেন। জেসমিনের সবই ভাল,শুধু একটাই সমস্যা। সে স্টার জলসা আর জি বাংলার একনিষ্ঠ দর্শক।তার সব মুখস্ত কখন কোথায় কোন নাটক চলছে। এবং খুব কম বাংলা সিনেমা আছে যেটা সে দেখেনাই। আমার নাম নিয়েও তার সমস্যা। ওর মতে আমার নাম দিশা না হয়ে প্রিয়া হওয়া দরকার ছিল। ''আশিক প্রিয়া'' শুনে নাকি সেরকম একটা ফিলিং আসে।
আজকে হল সপ্তাহের ''নো সিরিয়াল দিন'' মানে রবিবার। আজকে তার সিনেমা দেখার দিন।
আবারও জিজ্ঞেস করল সে
''এই ফিলিমের নাম কি আফা?''
আমি ভয়ানক অস্বস্তি নিয়ে জেসমিনকে জবাব দিলাম ''টোয়াইলাইট''
নামটা শুনে কুটকুট করে হেসে দিল সে। ''এতো কিছু থাকতে আপনে টয়লেট দেখতাসেন ক্যান?''
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম । এই মেয়ে বলে কি?
''টয়লেট না জেসমিন। ''''টোয়াইলাইট''''। এর মানে সন্ধ্যা''
''ওই একই কথা আফা,যেই লাউ সেই তো কদু। সইন্ধ্যা কালে যায় বলে এইডা তো আর আলাদা না।''
এবার অবশ্য আমি ওর কথাকে শুনিনাই ভাব দেখালাম। বেশী পাত্তা দিলে ওর বকবকানি এখন চলতেই থাকবে।
''আফা,ইকটু দেখেননা কোথাও বাংলা সিনেমা চলে নাকি? মেলাদিন দেখিনাই''
আমি আবারও ওর কথা না শুনে ফিল্ম দেখতে লাগলাম। এবার ও একটু দুখি দুখি ভাবে বলতে লাগল
''আমাদের বাসায় তো টেলিভিশন নাই, তাই আপনেগো এখানে একটু দেখতে মন চায় আর কি? আমরা তো গরিব মানুষ। যাউকগা,আপনে তো টয়লেট পরেও দেখতে পারবেন। আমি তো আর পারুম না''
এবার আমি চ্যানেল চেঞ্জ করে দিলাম। জেসমিনের ইমোশনাল অত্যাচারের  জন্য না। এটা ওর স্বভাব। যখনি ওর কোন কিছু দেখতে হয় ও এসব কথাই বলতে থাকে। আমি চেঞ্জ করলাম কারন ''টয়লেট'' শব্দটা শুনে আমার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। আর কয়েকবার শুনলে দেখা যাবে আমি মুভির আসল নামটা ভুলে 'টয়লেট' বলা শুরু করে দিবো! আমার কাছে ডিভিডি আছে,পরে একা একা দেখা যাবে।
সৌভাগ্য বশত একটা চ্যানেল পেলাম যেখানে বাংলা সিনেমা চলছে। আশিক বন্ধুদের সাথে পিকনিকে গেছে। ওর সাথে কথা হবে আরো কয়েক ঘণ্টা পর। আপাতত বাসায় আমার আর কিছু করার নেই,তাই আমিও জেসমিনের সাথে ফিল্ম দেখতে লাগলাম। যা বুঝলাম তা হল-
শাবনুর নায়িকা,শাকিব খান আর ফেরদৌস নায়ক। ত্রিভুজ প্রেমের গল্প । তিনজনেই একই কলেজে পড়ে। শাবনুর হল কলেজের সেরা সুন্দরী...(মাশা আল্লাহ,অনেক নতুন একটা বিষয়)
শাকিব খান কলেজের সবচেয়ে স্মার্ট ছেলে (এটাও অনেক নতুন)
ফেরদৌস হল কলেজের সবচেয়ে ভাল এবং পড়ুয়া ছেলে (আর বললাম না)
ফেরদৌস ভাই চোখে দেখেন না। এবং তিনি আর শাকিব বেস্ট ফ্রেন্ড। এবং তারা দুজনেই আবার শাবনুরকে ভালবাসেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে শাবনুর কাকে ভালবাসবে? ভাল ছেলে ফেরদৌস না প্লেবয় শাকিব কে কে কে কে কে কে..... আশিক থাকলে ঠিক এমন করতো ভেবে আমি হেসে দিলাম। জেসমিন ভাবল আমি অনেক মজা পাচ্ছি
''দেখলেন তো আফা,শাকিব খান কত্ত সুন্দর! মাসুম বাচ্চা! আপনের টয়লেট এর নায়কডারে কেমন ভুত ভুত লাগে।''
''চুপচাপ দেখো,আর কোন কথা বললে টিভি বন্ধ করে দিব কিন্তু!''
হুমকি কাজে আসলো। সিনেমাটা দেখাই এ মুহূর্তে জেসমিনের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। শুধু মাঝে মাঝে ও
''হায় হায়,এইডা কি করলি'' ''ঠিক হয়নাই,একদমই ঠিক হয়নাই'' ''মাইয়া তর মাথায় গদাম'' এই সব বলে বিড়বিড় করতে লাগলো।
কিছুক্ষণ পর নিপু রুমে আসলো। সেও দেখি আমাদের মত খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে। তাকে জেসমিন আবার গল্পের প্লট বুঝিয়ে দিলো।
যে মুহূর্তে ওকে আমি বললাম যে ফেরদৌস অন্ধ।
নিপুর প্রথম কথাটা ছিল ''ও অন্ধ হলে পাওয়ার গ্লাস কেন চোখে?''
এবার আমিও খেয়াল করে দেখলাম,আসলেই তো! সেই তখন থেকে ফেরদৌস চোখে পাওয়ার গ্লাস দিয়েই ঘুরছে। হাসতে হাসতে আমার আর নিপুর অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। 
জেসমিনের ব্যাপারটা পছন্দ হলনা,শাকিব খানের পর ফেরদৌস ওর প্রিয় নায়ক। ''আফা এইডা হল নায়কের ফ্যাশন। ফেরদৌস হল এই ফিলিমের ভদ্দর নায়ক। এইজন্যই চশমা পরসে। এগুলান আপনেরা বুঝবেন না''
আমি আর নিপু মাথা নেড়ে ''ঠিক বলেছ,আমরা বুঝবনা'' বলে আবার হাসি। হিহিহি




আজকে পহেলা বৈশাখ। দুপুরে খেতে বসেছি। আজকে সব আমার পছন্দের আইটেম। আলু ভর্তা,শুঁটকি ভর্তা,বেগুন ভর্তা আর ইলিশ মাছ ভাজা। সাথে ঘন করে ডাল। আশিকের সাথে পরিচয়ের পর থেকে কেন যেন আমার ভর্তা প্রেম বেড়ে গেছে। আশিকের ধারনা ওকে কিলিয়ে ভর্তা বানাতে পারিনা দেখে ভর্তা খেয়েই আমি সুখ পাই। যেভাবে আমাকে যন্ত্রনা দেয়, তেমনটা হলেও হতে পারে।
বেগুন ভর্তা দিয়ে ভাত মেখে মাত্র দু গ্রাস মুখে দিলাম,এমন সময় মোবাইলে ওর কল
''এক্ষুনি বের হয়ে নিচে আসো''
''আমি ভাত খাচ্ছি তো,পনের মিনিট পর আসি''
''ভাত সারাজীবন খেতে পারবা,কিন্তু আশিক সারা জীবন নাও থাকতে পারে''
শুরু হল জনাবের নাটক। এই নাটক দেখতে দেখতে আমার জীবন শেষ হয়ে গেল। এতো বড় কথা শোনার পরও আমি সামান্য ভর্তা দিয়ে ভাত খাওয়ার জন্য বসে থাকব,এতটা পাষাণী এখনো হইনি! [আসলে ওর চোখ রাঙ্গানিকে অনেক ভয় পাই]

বের হবার সময় দরজায় বাড়ি খেয়ে,সিঁড়ি থেকে পড়ে যাওয়া থেকে কোনমতে বেঁচে যখন গেটে এসে দাঁড়িয়েছি। দেখলাম আশিক ওদের গেটের সামনেই আছে,আমাকে দেখে মোবাইলে কল দিল
''গেটের ভেতর দিকে একটা প্যাকেট আছে,ওটা নাও তো''
আমার হাতে দিয়ে গেলে কি হত? আমি আশেপাশে দেখলাম,ধ্যাত কোন প্যাকেটই তো দেখতে পাচ্ছিনা।
আশিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল '' তোমাকে নিয়ে যে কি করবো,আরে বাবা তোমার ডান পায়ের কাছে দেখো''
তখন তাকিয়ে দেখলাম একটা বড় প্যাকেট পড়ে আছে। আমি এক হাত দিয়ে নিতে নিতে বললাম ''এটাতে কি?''
''নিজেই দেখনা,আমি কেন বলব?''
আমার মনে হল একটা শাড়ির প্যাকেট।
''শাড়ি কার জন্য?''
''তোমার আম্মুর জন্য। আন্টির হাতে দিও''
''আজব,তুমি দিলেও তো পারতে। আম্মু অনেক খুশী হত ''
''আচ্ছা দিশা,তুমি আসলে কি এতটাই বেকুব? শাড়িটা তোমার জন্য। এটা পড়ে আধ ঘণ্টার মধ্যে বের হয়ে আসো। আমরা আজকে ঘুরতে যাব''
আমাকে বেকুব ডাকার কারনে আমি যে ঝগড়া করবো সেটা সম্ভব হলনা। কারন তার পরের কথাটা শুনে আমি টাশকি খেয়ে গেছি। আমি পড়বো শাড়ি? শাড়ি আমার খুব ভাল লাগে। কিন্তু আমার অনেক সমস্যা হয় শাড়িতে। আশিক কি পাগল নাকি! ও জানেনা আমি দুই পা হাঁটতে গেলেই উষ্ঠা খাই?
''আশিক,তুমি জানো আমি শাড়ি পড়িনা''
''আজকে পড় প্লিজ? আমার জন্য''
এই তো,ঠিক এই জিনিসটাকে আমি ভয় পাই। ও যদি ঝগড়া করত,আমিও গলার রগ ফুলিয়ে ঝগড়া করতাম। কিন্তু এভাবে যখন ও অনুরোধ করে তখন আমি কিছু বলতে পারিনা। এই ছেলে এটা বুঝে ফেলেছে। বেশী চালাক। এতো বুদ্ধি কোত্থেকে যে পায়!


আমি শাড়ি পড়েছি দেখে আম্মু অনেক খুশী। জেসমিন দেখি আম্মুর চাইতেও বেশী মজা পাচ্ছে। বের হবার সময় ও দরজা বন্ধ করতে আসলো।
''আফা,নায়ক ডাকলে নায়িকার দৌড় দিয়া যাইতেই হইব। ওই যে ওই সিনেমাতে দেখেন নাই। শাকিব খান কি সুন্দর বৃষ্টিতে গান গাইতেসিল,আর নায়িকা ছাতা নিয়া চইলা আসলো? আপনেও গানটা গাইয়েন''
''চুপ'' আমার ধমক শুনে জেসমিনের কথা বন্ধ হলেও সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আমি স্পষ্ট শুনলাম ও গুনগুণ করছে
''কি জাদু করেছ বলনা? ঘরে আর থাকা যে হলনা ''

আমি সাবধানে বাসা থেকে বের হয়ে এলাম। আশিক বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। ওকে দেখে আমার মনটা ভাল হয়ে গেল। ও ঠিক আমার শাড়ির সাথে মিলিয়ে পাঞ্জাবি পড়েছে। কেন যেন এখন আর অতটা খারাপ লাগছে আমার।
''তোমার পেটে এতো প্ল্যান,আগে বলনি কেন?''
''প্ল্যান তো সবে শুরু ম্যাডাম। আর অনেক কিছু  বাকি'' ও আমার হাতটা নিজের হাতে নিল ''আমি থাকতে তোমার সাথে খারাপ কিচ্ছু হবেনা,প্রমিজ। শুভ নববর্ষ ''
নববর্ষের দিনটা সত্যি অনেক ভাল কেটেছিল।





সব লাভ স্টোরিতে কোন না কোন ঝামেলা হয়। কিন্তু আশিক আর আমার বিয়েতে যে কোন বাঁধা আসতে পারে এটা আমার মাথায় আসেইনি। আমাদের দুজনেরই ফ্যামিলি রাজি। জেসিমিনের বাংলা সিনেমার মত পারিবারিক শত্রুতা,মতের অমিল,টাকা পয়সার সমস্যা কোন কিছুই ছিলনা। আশিক আসলে একটু হতাশই ছিল এত সহজে সবাই মেনে নিয়েছে দেখে। জেসমিনের ভালই প্রভাব পড়েছে ওর উপর। ''পালায় বিয়ে করবো'' ''প্রেম মানেনা কোন বাঁধা'' ডায়লগ গুলো কাউকে শোনাতে পারছেনা দেখে ও বেশ হতাশ। তবে বেশী সহজ ভাবলে সরল জিনিসও জটিল হতে সময় লাগেনা। আর যেহেতু এখানে আমি ইনভল্ভড আছি,কিছু তো হতেই হবে।
তাই সমস্যাটা হল সম্পূর্ণ অন্যভাবে।
তখন এঙ্গেজমেন্ট এর কথা হচ্ছে বাসায়। আঙ্কেল চাইছেন এর পরের মাসেই করিয়ে দিতে। দুজনের পড়ালেখা শেষ হলে তারপর বিয়েটা হবে। সবাই রাজী। এ আলোচনা উপলক্ষে আমাদের দুজনেরই আত্মীয় স্বজনের ভালোই সমাগম ঘটছে। বেশ একটা উৎসব মুখর পরিবেশ। নিপু তো আমার বিয়েতে কি করবে তারও প্ল্যানিং শুরু করে দিয়েছে। সাথে জেসমিনও ওর উর্বর মস্তিষ্কের প্রমান দিচ্ছে। ওর কিছু আইডিয়া তো বরাবরের মতই ভয়ঙ্কর।
একটা ছিল এরকম, পাল্কিতো খুব কমন জিনিস। আমাদের উচিত আনকমন কিছু করা। যেমন আমি যদি ঠেলাগাড়িতে করে হলুদের স্টেজে আসি তাহলে নাকি খুব অন্যরকম লাগবে!
সবচেয়ে ভয়াবহ আইডিয়া ছিল যে,আশিক হাতির পিঠে চড়ে বিয়ে করতে যাবে। আর আমার পক্ষের মেয়েরা সবাই নেচে ওকে স্বাগতম জানাবে।
নাচের জন্য একটা গানও ঠিক করে ফেলেছিল সে,কথা গুলো এরকম

''আসসালামালাইকুম বেয়াই সাব,ওয়ালাইকুম আসসালাম বেয়াইন সাব
কেমন আছেন বেয়াই সাব? বুকে বড় জ্বালা
কিসের জ্বালা বেয়াই সাব? নয়া প্রেমের জ্বালা
এই জ্বালাতে পুড়বে নাকো কোন শালি শালা?''

নিপুর চিল্লাচিল্লি আর আমার থমথমে চেহারা দেখে ও আপাতত ক্ষান্ত দিয়েছে। কিন্তু আমি শিওর ওর মাথায় আরো অনেক কিছু গিজগিজ করছে।
এর মাঝে আশিক জানাল যে ওর দাদীজান আসবে আমাকে দেখতে। আমাকে ভয় দেখানর জন্য নাকি জানিনা,আশিক আমাকে বলেছিল যে ওর দাদীজান নাকি সহজে কাউকে পছন্দ করেননা। ভয়ে আমার কলিজা শুকিয়ে এতটুকুন হয়ে গেল।


আশিকের দাদীজান এলেন বাসায় আমাকে দেখতে। আমি শাড়ি পড়তে পড়তে যত দোআ জানি সব পড়ে ফেললাম। শাড়ি না পড়লেও হত,কিন্তু মনে হল যে দাদীজান খুশী হবে। এতো ভয় যে কেন লাগছে? এমন কিছু ভয়ঙ্কর কাজ তো না। দাদীজানের সামনে যাব,পা ছুঁয়ে সালাম করবো। আর কিছুক্ষণ কথা বলব। ভয়ের কিছু নেই।
আমি পা টেনে টেনে ড্রয়িং রুমে গেলাম। দাদিজান সোফায় বসে আছেন। উনি আমাকে দেখে একটা হাসি দিলেন। কেন যেন হাসিটা দেখে আমার মনে হল ''তোরে আজকে খাইসি'' টাইপের মনে হল। আমি মনে হয় আসলেই পাগল হয়ে যাচ্ছি।
আমি সালাম করলাম উনাকে।  আমি বসার পর দাদীজান আমাকে একের পর এক প্রশ্ন করতে লাগলেন। কেমন আছ ভাল আছ টাইপের কোন কথা না। এক্কেবারে যাকে বলে ইন্টারভিউ। হাত কাপাকাপি শুরু হয়ে গেছে ততক্ষণে। আরেকটু হলে আমি দাদীজানের গায়ে গরম চায়ের কাপ উল্টে ফেলেই দিয়েছিলাম। ভাগ্যিস,পানির গ্লাসটা উনার গায়ে না পড়ে সোফায় পড়েছিল।
অনেক প্রশ্ন করলেন তিনি,জবাব দিতে দিতে আমি ক্লান্ত হয়ে গেলাম। শেষের দিকে জিজ্ঞেস করলেন
- এর আগে কারো সাথে সম্পর্ক ছিল?
আমি বেকুবের মতো তাকিয়ে থাকলাম। এটা কি হল? আশিকের সাথে আমার ব্যাপারটা জেনেও উনি এটা কি বলছেন?

আমি দাদীজান চলে যাওয়ার পর সবার আগে আশিককে কল দিলাম।
-আশিক,তোমার দাদীজান কি জানেনা যে তোমার আমার অ্যাফেয়ার আছে?
-দাদীজান,প্রেমের বিয়ের একদম বিপক্ষে দিশা। সত্যি কথা বললে দাদীজান কখনোই মানবেনা।
-আমরা এমন কোন খারাপ কাজ করিনি। শুধু শুধু মিথ্যা বলে বিয়ে করবো কেন?
-এখানে এতো আপসেট হবার মত কিছুই হয়নি।
-মিথ্যা বলার মত কিছুও হয়নি। প্লিজ আশিক,সবসময় মিথ্যা বলে কাজ হয়না। তোমার দাদীজান আর আমি এক মানুষ না।


এই প্রথম আশিকের সাথে আমার এরকম মারাত্মক ঝগড়া হল।
অনেক তর্ক হল সেদিন রাতে। ও কোনমতেই সত্যি কথা বলবেনা। আমিও নিজের জায়গায় অনড়। মিথ্যা বলে বিয়ে করবনা। শেষরাতের দিকে আমি ওকে বললাম ও যদি না বলে আমিই পরের দিন এসে দাদীজানকে সব জানাবো।
পরেরদিন আমার আর যেতে হলনা। ও বাসা থেকে খবর এল দাদীজান এই বিয়েতে রাজী না। তিনি আরো বলেছেন এই বিয়ে হলে তিনি আশিকদের কারো মুখ দর্শন করবেননা। সত্যি কথা বলতে কি যত টুকু খারাপ লাগা উচিত ছিল ততটুকু লাগেনি। অন্তত মিথ্যা বলার চেয়ে অনেক ভাল। দাদীজান ছাড়া আশিকের ফ্যামিলির এই বিয়েতে কোন আপত্তি নেই। কিন্তু আমি বেঁকে বসলাম।
সবাই হয়ত ভাববে যে আমি বাড়াবাড়ি করছি। কিন্তু আমি যে পরিবারে যাব,তার একজন অতি গুরুত্বপূর্ণ মানুষ আমাকে মেনে নিবেনা। আমার জন্য একটা ফ্যামিলির মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি হবে, এটা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য না। আশিক আমাকে অনেক বুঝাতে চেষ্টা করেছিল,কিন্তু আমি ওকে বলে দিলাম আমাকে যাতে ও আর কল না করে। ছোটবেলা থেকে আব্বু আম্মু আমার লাইফের সব সিদ্ধান্ত আমাকেই নিতে দিয়েছেন। সবসময়ের মত এবারো তাঁরা আমাকে সাপোর্ট দিলেন। শুধু নিপু অনেক বিরক্ত হয়ে বলেছে
''আপু,তুই আসলেই অনেক ঢং করিস''






গত কয়েকটা মাস অনেক কষ্টে কেটেছে আমার। এভাবে পালাতে ইচ্ছা হচ্ছে না আর। আশিকের কাছ থেকে দূরে থাকতে আমি আমার ফুপুর বাসায় চলে এসেছি। ওর কল রিসিভ করিনা দেখে ও অনেক পাগলামি শুরু করেছিল। ঘর থেকে বের হলে বা বারান্দায় গেলেই দেখতাম ও ওদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আর আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। ওর চাহুনিটা এতো যন্ত্রণাদায়ক! এদিকে বাসায় নিপু রাগ করে আমার সাথে আর কথাই বলেনা । শেষ পর্যন্ত আব্বু আম্মুকে একটা ব্রেক দরকার বলে ফুপুর বাসায় চলে এলাম।  
বেশ কদিন ধরেই বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি হলেই আমার অনেক কিছু মনে পড়ে যায়। আর এত্ত খারাপ লাগে!আর দাদীজানের উপর রাগ লাগে। প্রেম করে বিয়ে করলে এমন কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়? দুপুরের দিকে আজকে যখন ঝুম বৃষ্টি নামলো আমি আর ঘরে থাকতে পারলাম না। ফুপুরা সবাই ঘুমুচ্ছে। আমি কাজের মেয়েটাকে দরজা লাগাতে বলে বের হয়ে গেলাম ছাতা হাতে।
প্রথমে ভেবেছিলাম রিক্সায় একা কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়াব। কিন্তু বৃষ্টিও এক নাম্বারের বেইমান। আমি বের হবার পর একদমই কমে গেল। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকার কোন মানে হয়না,পাশেই একটা পার্ক আছে। সেখানে গিয়ে ঢুকলাম। ছাতাটা ফোল্ড করে ফেলেছি। দরকার হলে এই ফকিরা বৃষ্টিতেই ভিজব।
হালকা বৃষ্টির মাঝে দাঁড়িয়ে আছি,তবু অনেক পুরানো স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে ।পুরো শরীরে কেমন এক অদ্ভুত দুঃখ মেশানো  সুখ সুখ অনুভুতি হচ্ছে। আগে মনে হত একা একা ভিজতে ভাল লাগবেনা। কথাটা আসলে সত্যি না। মানুষ কখনও একা থাকে না,মস্তিষ্কের ধূসর কোষের জমিয়ে রাখা স্মৃতিগুলো সব সময় কলরব করতে থাকে।
আমার মন বলছে বৃষ্টি আরো জোরে পড়ুক,সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাক।
আমার খুব গান গাইতে ইচ্ছা হচ্ছিল। আমি চোখ বন্ধ করে গুনগুণ করলাম

''মোরা ভোরের বেলায় ফুল তুলেছি দুলেছি দোলায়
বাজিয়ে বাঁশি গান গেয়েছি,বকুলের তলায়
হায় মাঝে হল ছাড়া ছাড়ি,গেলেম কে কোথায়
আবার দেখা যদি হল সখা,প্রানের মাঝে আয়
পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কিরে হায়
ও সে চোখের দেখা প্রানের কথা, সে কি ভোলা যায় ………''


পেছন থেকে আওয়াজ শোনা গেল
''কার যেন বৃষ্টিতে ভিজলে ঠাণ্ডা লাগে? আজকে বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে একেবারে গান গাওয়া হচ্ছে! ঠাণ্ডা কোথায় গেল?''
আমি চোখ খুলে দেখলাম আশিক। আমি তেমন অবাক হলামনা। ও আসবে আমি জানতাম।
''কোথায় যেন পড়েছিলাম বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে কাঁদলেও নাকি চোখের পানি বোঝা যায় না,পুরাই ভুয়া কথা...কান্না করার সময় চোখ লাল হয়ে ছোট ছোট হয়ে যায়,যেমন এখন তোমারটা হয়েছে। নাকি তোমার মত কানাদেরই শুধু এমন হয়?'' সর্বনাশ,আমি কি কাঁদছিলাম নাকি?
''এখানে কেন এসেছ?'' বলতে বলতে ওকে দেখছিলাম। কত্ত দিন পর দেখা হল !
''হাহ্,আমাকে ছেড়ে আসা এতো সহজ না। তুমি যদি জাহান্নামেও লুকাও আমি ঠিকই খুজে বের করবো''
''সবসময় নিজেকে এত গুরুত্ত দাও কেন? আমি এখানে ঘুরতে এসেছি''
''আমিও ঘুরতেই এলাম,এসে দেখলাম এই পিঁপড়া মার্কা বৃষ্টিতে একজন মহা সূখে গান গাচ্ছে। এতো মধুর গলা শুনে ভাবলাম সুকণ্ঠী গায়িকাকে একটু দেখে যাই''
আমার ওর এই দার্শনিক হাবভাব দেখতে একদমই ভাল লাগছিলনা। অনেক ক্লান্ত লাগল হঠাৎ
''তোমার কথা শেষ ? আমি এখন যাব''
''এতো সহজ? যেতে চাইলেই যেতে দিব নাকি?''
বলে হাতটা ধরে ফেলল আশিক।
''হাত ছাড়ো আমার''
'ছাড়ার জন্য তো ধরিনি আমি,চল আমরা দুজন মিলে গাই
পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কিরে হায়
ও সে চোখের দেখা প্রানের কথা, সে কি ভোলা যায়...''
আশিক মাথা দুলিয়ে গান গাচ্ছে। অবিশ্বাস্য! এই পরিস্থিতিতেও ওর এসব করতে ইচ্ছা কিভাবে হয়?
আমার তো রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে।
''আশিক,প্লিজ আর নাটক দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে না'
''নাটক এখনো শুরুই হয়নি,শুরু হলে তখন কি করবা?''
''তুমি খুব ভালভাবে জানো তোমার দাদী আমাকে পছন্দ করেননা,তো এসব করে লাভ কি?''
''বিয়ে তো করবো আমি,দাদীর পছন্দ দিয়ে কি হবে?''
আমি হাতটা ছাড়াতে চেষ্টা করছি কিন্তু পারছিনা। এমনিতে দেখতে হালকা পাতলা হলেও ওর হাতে অনেক জোর। ও হাসিমুখে আমার হাত টানাটানি দেখছে। আমি ঠিক করলাম এবার না ছাড়লে একটা খামচি দিব।
''বাই দা ওয়ে,তোমাকে একটা খবর দিতে এসেছিলাম। আমার দাদীজান বিয়েতে রাজী হয়ে গেছে''
কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমি জমে গেলাম। আশিক বলেই যাচ্ছে
''একটু নাটক করতে হয়েছে অবশ্য। ওটা আমি ভালই পারি। যখন দেখলাম কিছুতেই কিছু হচ্ছেনা। তখন বেশী কিছুনা,খাওয়া আর কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। ৩ দিনের দিন দাদী এসে বলল যে 'বাপ তোর যাকে ইচ্ছা বিয়ে কর। আমি কিছু বলবনা ' তিন দিন ধরে না খাওয়া আমি এখন অনেক ক্ষুদার্ত। আমার পেটে এখন ইদুর ডিস্কো ডান্স দিচ্ছে। আর কিছু না পেলে এখন ঘাস খাওয়া শুরু করে দিব। তার আগেই  চলতো দেখি সামনের হোটেলটায় কিছু পাওয়া যায় নাকি''


হোটেলে বসে আশিক মহানন্দে ভাত খাচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে কয়েকদিন ধরে কিছু খায়নি।  আমি প্লেট সামনে নিয়ে বসে আছি।
''খাচ্ছনা কেন?''
''তুমি খাও তো,আমি দেখি''
''আচ্ছা আমি খাইয়ে দে০ই''
ও এক গ্রাস ভাত নিয়ে আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। অন্য কোন সময় হলে আমি কখনোই এতো গুলো মানুষের সামনে এটা করতাম না। আমার আবার লজ্জা বেশী। কিন্তু আজকে খেলাম। 
আমি ঠিক জানিনা এরকম বেহায়া হবার কারন কি,কারন এটা আশিকের একান্ত ব্যাক্তিগত টাইটেল! কিন্তু ওই মুহূর্তে আমি আর কিছু ভাবতে পারিনি। আসলেইতো,ওকে ছাড়া আমি ভাল থাকব না। এটা ও আগে থেকেই জানতো,আজকে আমিও জানলাম।





অতঃপর-

বিয়ের বাদ্য বাজল শেষে
ও বর,আমি বধুর বেশে...

আশিকের বুদ্ধিতে এঙ্গেজমেন্ট না হয়ে সরাসরি বিয়ে হচ্ছে। আমি বলেছিলাম ওকে যে এতো তাড়াহুড়োর কি দরকার?ও জবাবে বলেছে
''তুমি তো মহাত্মা গান্ধীর লেটেস্ট ফিমেল ভার্শন, দেখা যাবে আবার কে এসে কি বলবে আর তুমি মহামানবীর মত বিয়েটা ভেঙ্গে দিবা। তোমাকে নিয়ে রিস্ক নিব,মাথা খারাপ নাকি? তোমার পক্ষে সবই সম্ভব। সবচেয়ে বড় কথা সবাইকে মানানোর জন্য আমি যদি না খেয়ে থাকা শুরু করি তাহলে একবছর পর আমি না,আমার কংকালকে বিয়ে করতে হবে''
''সব কিছুতে ফাজলামি না করলে হয়না?''
''ফাজলামি কই করলাম? সবসময় শুনে আসলাম মেয়েরা নাকি জলদি বিয়ে করতে চায়। তোমার বেলাতেই যত উলটা পুরাণ! শুনো,তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারবোনা। আর আমাকে ছাড়া তোমাকে আমি থাকতে দিবনা। তুমি এঙ্গেজড হয়েই আছ। তো আর এসবের কি দরকার? আমাকে ফেলে একবার তো পালিয়েছ। এবার নাহয় আমার সাথেই ভাগবা?'' এইকথার পর আমি আর কিছু বলতে পারলাম না। আবেগপ্রবন হয়ে কেঁদেই দিলাম। এই ছেলেটা এতো ভাল কেন?
''এই মেয়ে কাঁদো কেন? আরে এগুলাতো এম্নিতেই ডায়লগ দিলাম। আউচ...এই তোমার বাসায় নেইল কাটার নাই নাকি? এত্ত বড় নখ!!!''


বিয়ের দিন আমার পাশে বসে আশিক যখন বসেছিল আমি তখনো বিশ্বাস করতে পারিনি যে আসলেই আমাদের বিয়েটা হচ্ছে। আশিক সারাক্ষণ প্যানপ্যান করছিলো ''ভেবে দেখলাম তোমাকে বিয়ে না করলে অনেক সমস্যা। সারা জীবন তোমাকে ঝামেলার হাত থেকে আমি ছাড়া আর কে বাঁচাতে পারবে বল দেখি,কার এত আজাইরা টাইম আছে?''
শুধু এটাই না,যখনি কেউ আমাদের শুভেচ্ছা দিতে আসছে বদমাশ ছেলেটা তাদের বলছে ''আমার বৌ চোখে ঠিকমত দেখেনা কিন্তু,আছাড় খেয়ে আপনাদের গায়ে পড়লে মাফ করে দিবেন''
শেষের দিকে জেসমিনের হাউমাউ কান্না দেখে আমি লজ্জায় একশেষ। আশ্চর্যজনক কথা হল আমি কাঁদব কি,খুশীর চোটে কান্না কান্না ভাবও আনতে পারছিনা। আশিক বলতে লাগল
''জেসমিনের থেকে কিছু শিখতে পারলেনা? ওর কান্না দেখে মনে হচ্ছে বিয়েটা ওর,তোমার না। এমনিতে কিছু হলেই ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদো। আজকে একটুও কাঁদলানা...ছ্যাঃ ছ্যাঃ...সবাই বলবে কেমন বেহায়া বৌ!...আমার সব মান সম্মান ধুলায় মিশে গেল''
অন্য কোন দিন হলে ওর পিঠে ধুম ধাম কিল মেরে দিতাম। কিন্তু এবারের মত ছেড়ে দিলাম। আজকে আমি একটুও রাগ করবনা। সারা জীবন পড়ে আছে শোধ নেবার জন্য। আজকের দিনটা আমার ভেটকি মাছটা এভাবে বলে যাক।




পুনশ্চ-
জেসমিনের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। ওর মতে ওর হবু জামাই নাকি একদম শাকিব খানের মত মাসুম! আমার বিয়েতে ও এমন হাউমাউ করে কেঁদেছে কেন জিজ্ঞেস করেছিলাম।ও নাকি প্র্যাকটিস করছিল যাতে নিজের বিয়েতে ভালভাবে কাঁদতে পারে। আমার মত দাঁত বের করে হাসলে ওর ''প্রেস্টিজ পাঞ্চার'' হয়ে যাবে না?


পৃথিবীর সব ভেটকি মাছ(!!) আর কানা বেড়ালের জন্য অনেক ভালবাসা...


নাজমুন নুসরাত

3 comments: