Subscribe:

আঁধারের অরুন্ধতি-২ ( নীল বৃত্তান্ত )

- আপনি আমাকে কেন বিয়ে করেছেন ?
নববধুর মুখে এই প্রশ্ন শুনে উঠে বসেছিলাম আমি । অনুফার সাথে বিয়ে হয়েছে সবে । প্রথম রাতে নববধুর প্রশ্নে বিব্রত বোধ করেছিলাম । অকারণেই গলা খাঁকারি দিয়ে অস্বস্তি দূর করার চেষ্টা করতে লাগলাম তাই । পাশে হাঁটু মুড়ে বসে আছে অনুফা । ভাসা ভাসা অবাক চোখে তাকিয়ে আছে অনুফা । বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলাম না । চোখ নামিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগলাম-

- বড় চাচার আদেশ অমান্য করার ক্ষমতা আমার নাই । আমি ছোটবেলা থেকে তার কাছে মানুষ । তার প্রতিটা কথা আমার কাছে আদেশের মতো ।
- আমার সব কথা শোনার পরও আপনার বড় চাচার কথা মেনে নিতে আপত্তি হয়নি ?
- শুয়ে পড়ো অনুফা । সারাদিনে ম্যালা ধকল গিয়েছে তোমার উপর দিয়ে । এসব নিয়ে পরে কথা বলব ।
বলেই পাশ ফিরে শুয়ে পড়লাম । খাটে নাড়াচাড়া অনুভব করলাম । বুঝলাম জবরজং বিয়ের পোষাকেই শুয়ে পড়েছে অনুফা । ঘুম আসে না আমার । ঘুমানোর চেষ্টা করতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম,অবশিষ্ট ঘুমটুকুও ফাঁকি দিয়ে চোখ থেকে বিদায় নিয়েছে । পুরো রাত অনুফার সাথে দেখা হওয়ার দিনটির কথা ভাবতে ভাবতে ভাবতে কেটে গেলো ।

কয়েকদিনের ছুটিতে বাড়িতে এসেছিলাম । রুপপূর কলেজে ডিগ্রীর ছাত্র ছিলাম তখন । অনেক লম্বা ছুটি পড়েছিলো কেন জানি । কলেজ বন্ধ পড়ে যাওয়ায় বেড়াতে যাই গ্রামের বাড়ি রাজাপুরে ।
সেদিন জুম্মাবার ছিলো । সৈয়্যদ আজহার মুন্সী,আমার বড়চাচা আমাকে বৈঠকে ডেকে নিয়ে গেলেন । আচমকা বলে উঠলেন, “তোকে বিয়েশাদী দিব ভাবছি । নবীজির সুন্নত,একসময় না একসময় পালন করতেই হতো । চাকরী-বাকরী যদিও কিছু করিস না,তাতে অসুবিধা হওয়ার কথা না । আমার কাছে থাকিস । যা আছে চাচা-ভাতিজার বেশ চলে যায় । আরো দুইতিনজন মানুষ অতিরিক্তও খাওয়ানো যাবে ।"

আমি চাচার দিকে অবাক হয়ে তাকাতেই,চাচা বলে উঠলেন, " তাই বলে আবার ভাবিস না দুই বিয়ে করার পারমিশন পেয়ে গেছিস । হা হা...”

মাথা নিচু করে শুনতে লাগলাম চাচার কথা । হঠাৎ বিয়ের প্রসঙ্গে চমকে উঠলেও ততক্ষণাৎ কিছু বলিনি আমি । চাচা পুরোনো আমলের বিএ পাশ মানুষ । এখনো তার সাথে কথা বলে পেরে ওঠে এমন মানুষ আশেপাশের দশগ্রামে নেই । তাছাড়া, চাচার জন্য সবসময় প্রচন্ড ভক্তি কাজ করত । বাবার মৃত্যুর পর, নিজের ছেলের মত মানুষ করেছেন আমাকে । চাচা কোন ভুল সিদ্ধান্ত নিবে না,এই বিশ্বাসটুকুন ছিলো । বড়চাচা বলে যেতে লাগলেন-

“মেয়ে আমি পছন্দ করে ফেলেছি । তোর থেকে বছরখানিকের ছোট কেবল । তোরও অবশ্য বয়স কম,পড়ালেখা শেষ করিসনি । এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে না করলে চলত । পুরুষ মানুষের জন্য বয়স ব্যাপার না । পুরুষ মানুষ ১৮ তে যা ৮৮ তেও তা । হা হা ...”

হাসতে হাসতেই হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন । ভালো করে বড় চাচার দিকে তাকালাম । তার হঠাৎ এই পরিবর্তন লক্ষ্যনীয় । বুঝতে পারলাম,কোথাও কোন গড়মিল আছে ।

“মেয়ের একটা সমস্যা আছে । তার একটা বাচ্চা মারা গেছে মাসখানেক আগে । বিয়ে হয়নি এখনো । ভাইয়ের কাছে মানুষ । মেয়ে অসম্ভব সুন্দরী । ভুল করে ফেলেছে একটা । বয়সের দোষ আর কি । এখন ভাইয়েরা মেয়েকে নিয়ে বিপাকে পড়ে গেছে । আমি অবশ্যি এদের খুব পছন্দ করি । এদের বাবা আমার সাথে যুদ্ধ করেছে । বাবা-মা ছাড়া মেয়েটাকে কেমনে এই দূর্দিনে একলা ছেড়ে দেই ? তুই মানা করিস না,বাবা । মেয়ে জাতি বড়ই আজব । এরা ভালোবাসার কাঙ্গাল । তা পেলেই পায়ের কাছে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে আপত্তি করে না । ”

এতো লম্বা কথার পর দম নিতে থামলেন মুন্সী সাহেব ।

আমার দিকে তাকাতেই, বললাম, “আপনি যা ভালো বোঝেন চাচাজান ।”
আসলে ওই মূহুর্তে আর কিছু বলতেও পারিনি । চাচার সামনে কোন কথা গুছিয়ে চিন্তা করতে পারতাম না ।
আমার কথা শুনে মুখের হাসি বিস্তৃত হয় তার । তৃপ্তির সাথে বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ”

যোহরের নামাজের পর তিনি প্রায় বগলদাবা করে আমাকে নিয়ে মেয়ে দেখতে গেলেন ।

গ্রামের বাড়ির সাজসজ্জা বিহীন তবে পরিপাটি বৈঠক । ঘরের একদিকে চারটি কাঠের চেয়ারের বিপরীতে রাখা খাটের বসে আছে ছিলাম । মাথার উপর নড়বড়ে ভাবে আওয়াজ তুলে ফ্যান ঘুরছে । ফ্যানের নিচে বসেও শার্ট ভিজে জবজব । কেমন থমথমে পরিবেশ । চাচা একলাই কথা বলে যাচ্ছেন পরিবেশ হালকা করার জন্য । মেয়ের বড় ভাই বসে আছেন,পাশেই । দেখে মনে হলো খুব মনোযোগ দিয়ে কথা শুনছেন । কথাবার্তার এক পর্যায়ে মেয়েকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন আরেকজন মহিলা,পরে জেনেছিলাম,তিনি মেয়ের ভাবী হন সম্পর্কে ।

আমি কিছুটা অবাক হয়েই তাকিয়ে ছিলাম । এতো সুন্দর মানুষ হয় ! আড়চোখে তাকাতেই দেখলাম,তিরতির করে মেয়ের আঙ্গুল কাঁপছে । এতো ভয় পাচ্ছে কেন মেয়েটা ?

আমার সামনেই বিয়ের দিন-তারিখ ধার্য হলো । কথার এক পর্যায়ে মেয়ের বড় ভাই,বড় চাচাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন । মেয়ের দিকে তাকালাম,দেখলাম দুফোটা মুক্তো গড়িয়ে পড়েছে তার চোখ দিয়েও ।

৯ জানুয়ারী বিয়ের দিন ধার্য হলো । তেমন কোন জাঁকজমক ছাড়াই বিয়ে সম্পন্ন হলো আমাদের ।

খুব অবাক লাগছিলো । কত দ্রুতই না মেয়েটিকে অধিকার করে নিলাম । অথচ গুছিয়ে রাখা প্রশ্ন গুলো কিছুই করা হলো না । নতুন জীবন টা শুরুর আগে ভেবেছিলাম,অনুফাকে তার মনের সব রাগ,ক্ষোভ,দুঃখ সব ঝেড়ে ফেলার সুযোগ দিব । কিন্তু,জীবনে মনে হয় এমন সময় বহুবার আসে যখন অনেক কিছু বলার থাকলেও বলা হয় না ঠিক ।

বিয়ে হয়ে গেলেও দূরত্বটা কেন জানি হাইফেন হয়ে ঝুলে রইলো,আমাদের মাঝে । খালি বাড়িতে অনুফার সঙ্গী হলো ১০ বছরের আফিফা । চাচা বয়সের ভারে ধীরে ধীরে কাবু হয়ে পড়ছিলেন । নামাজ আর বিশ্রাম ছাড়া অনুফার সাথে কোনরকম কথাবার্তায় অংশ নিতেন না তিনি । অনুফা ও ঘরের কাজ সেরে নিজের ঘরে এসে বসে থাকতো । প্রায় দিন রুমে আসলে দেখতাম অনুফা আর আফিফা লুডু খেলায় মেতে আছে । মেয়েটাকে পড়ালেখা শেখাতো অনুফা । আর বাকী সময়টুকু নীল রঙ্গের একটা ডায়েরীতে গুটুর গুটুর কি যেন লিখতো । খুব দেখতে ইচ্ছা হতো,এতো কি লেখে মেয়েটা ?

একই ঘরে থেকেও আমাদের কথাবার্তা কুশল বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো । এক মাস কেটে গেলো চোখের পলকেই । আমাদের ভিতরকার দূরত্বও কেটে যাচ্ছিলো ক্রমশই । কিন্তু,শহরে ফিরে যেতে হতো,তাই অনুফাকে ফেলে এলাম । শেষ বর্ষ এর পরীক্ষাও এসে পড়েছে । পুরোদমে তারই প্রস্তুতি চলছিলো ।

শহরে পৌঁছানোর পাঁচদিনের মাথায় অনুফার চিঠি পেলাম । খুব অবাক হয়েছিলাম । চিঠি আদান-প্রদান করার মতো এতোটা হৃদ্যতা তখনও ছিলো না আমাদের মাঝে । আরো অবাক হলাম,যখন দেখলাম চিঠি তে কিছুই লেখা নেই । প্রথমে একে ঠাট্টার একটা অংশ বলে ধরে নিয়েছিলাম । কয়েকদিন যেতে না যেতেই আবার চিঠি পেলাম । আবার সেই খালি চিঠি । এবার খুব মজা পেয়ে গেলাম । আমি ও তাই খালি কাগজ খামে ভরে চিঠি দিতে থাকলাম অনুফাকে । অনুফার একটা খালি চিঠি পাওয়ার সাথে সাথেই আমি আরেকটা পাঠিয়ে দিতাম ।

বাড়িতে ফেরার দিন ঘনিয়ে এলো । আমি অনুফার কাছে ফিরে যাচ্ছি ভেবেই শিহরণ অনুভব করলাম । কিন্তু,ফিরে গিয়েই চমকে উঠলাম । একি ! আমি তো এই অনুফাকে রেখে যাই নি । মাসখানিকের ব্যাবধানে কি হয়ে গেলো ? শুকনো জিরিজিরে দেহ নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে আছে অনুফা । চোখের নিচে কালো রেখা কেমন বিষাদের ছায়া ফেলে রেখেছে চেহারায় । বড় চাচা আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন, “আরো আগেই তোকে জানাতে চেয়েছিলাম । বউমা জানাতে দেয়নি ।”
আমি নির্লিপ্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলাম, “কি হয়েছে অনুফার ?”
চাচা বললেন, “বিধান বাবু বলেছিলেন হাড়ের ব্যারাম হয়েছে । আমি উপসদরে নিয়ে ভালো ডাক্তার দেখালাম,তারাও একই কথা জানালেন । বউমা মনে হয় বেশিদিন বাঁচবে না রে ।”
আমি মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলাম । চাচার চোখের পানি আমার উপর কোন প্রভাব ফেলল না । আমি গিয়ে অনুফার মাথার কাছে বসতেই অনুফা চোখ মেলে তাকিয়ে ছোট্ট করে একটু হাসলো । আমি মাথায় হাত রাখতেই,জমে থাকা জল বালিশে গড়ালো । ইশারায় কিছু যেন বলতে চাইলো । আমি মাথার কাছে মুখ নামাতেই ক্ষীন স্বরে বলে উঠল, “আমাকে মাফ করবেন তো?”
আমার মাথার ভিতর কি যেন ঝড় বয়ে গেলো । আমি হাহাকার করে বলে উঠলাম, “তুমি ভয় পেয়ো না । তোমার কিছু হবে না ।”
আমি ওর মুখে হাসির রেখা দেখতে পেলাম । কিছুটা ছোট বাচ্চার কথা শুনে বড়দের প্রশ্রয় মাখা হাসিটার মতো মনে হলো ।

আমি নাওয়া খাওয়া ছেড়ে সারাদিন অনুফার কাছে বসে থাকতে লাগলাম । মাঝে মাঝে প্রলাপ বকলে, “নীলন্তি” নাম টা শুনতে পেতাম । তখন এই “নীলন্তি”র খোঁজ বের করার মতো অবস্থা ছিলো না । কিছু সময় যখন ভালো থাকতো,সেই নীল ডায়েরীতে খুব কষ্টে কি যেন লিখার চেষ্টা করতো ।

নয়তো আফিফা পাশে বসে ছড়াগানের মতো কি যেন বলতো । অনুফা তা ই মনোযোগ দিয়ে শুনতো ।

এইভাবে আরো কয়েকটা দিন যেতেই সেই ভয়ানক মূহুর্ত টা সামনে দাঁড়িয়ে গেলো । আমি চোখের সামনে অনুফার মৃত্যু দেখলাম । এতো ভয়ঙ্কর মানুষের মৃত্যু !! এতো ভয়ঙ্কর !!

দিশেহারা হয়ে গেলাম । অনুফার মৃত্যুর পর আফিফাও চলে যায় । রাতে আমার ঘুম আসতো না । প্রতিরাতেই লুডুর আওয়াজ শুনতে পেতাম । আতঙ্কে অস্থির হয়ে চিৎকার করে উঠতাম প্রতিবারই ।

একসময় স্বাভাবিক হয়ে এলাম,কিন্তু অনুফার মায়া তাড়িয়ে বেড়াতো । বড়চাচা মারা গেলেন অনুফার মৃত্যুরও প্রায় চারমাস পরে । খালি বাড়িটা ভুতুড়ে মনে হতে লাগলো একসময় । একসময় ভিটে-মাটি সব বেচে শহরে চলে এলাম । ছোট্ট একটা চাকরি করে দিন চলে যেতো বেশ । বিয়ে আর করিনি । মহৎ ছিলাম বলবো না ,ঠিক সাহসে কুলোয় নি । বলা হয়নি,শহরে আসার পরও প্রায় রাতে লুডুর গুটির আওয়াজ পেতাম । মাঝে মাঝে অনুফাকেও দেখতে পেতাম । ভয় হতো,বিয়ে করলে অনুফা যদি না আসে আর ?

অনুফার ডায়েরীর কথা ভুলে গিয়েছিলাম । অনেকদিন পর পুরোনো ট্রাঙ্কটা খুলে অনুফার ডায়েরীটা খুঁজে বের করলাম । অনুফার মৃত্যুর পর অনুফার বড়ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ ছিলো বহুদিন । একসময় সে যোগাযোগ ও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো । সেদিন আমার অফিস শেষে বাসায় ফিরে দেখি বারান্দায় অনুফার বড় ভাই দাঁড়িয়ে । তার সাথে আলাপনের এক পর্যায়ে জানলাম, অনুফার মেয়ে বেঁচে ছিলো । জন্মের সাথে সাথে তাকে অনুফার থেকে সরিয়ে এক নিঃসন্তান দম্পতিকে দিয়ে দেন তার বড় ভাই ।

ডায়েরীটা খুঁজে বের করলাম । সেখানেই জানতে পারলাম “নীলন্তি” অনুফার মেয়েকে তার দেয়া নাম । সাথে সাথে মুখের মাংশপেশী শক্ত হয়ে গিয়েছিলো । মৃত্যুর আগে ও বারবার নামটি বলে গেছে,তখনও তারা অনুফাকে তার মেয়ের কথা জানায় নি । তাঁর কাছেই জানলাম,মায়ের ডায়েরীটা চাও তুমি । ঠিকানা পরিবর্তন করায় আমাকে খুঁজে বের করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিলো অনুফার ভাইয়ের । ঠিক করলাম আমি ই তোমার সাথে দেখা করবো । মায়ের লেখা ডায়েরীটা তোমার কাছে দিয়ে আসবো ।

অনুফার ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম তোমাদের ঠিকানা । তারপর নিজেই চলে এলাম ।

বলেই থামলাম । অরণীর চোখে পানি দেখতে পাচ্ছি । বুঝলাম এতো বছর পরেও অনুফার চোখের পানি অন্তর কাঁপিয়ে তোলে আমার । অরণী যখন ড্রয়িংরুমে এসেছিলো,তখন পানি খাচ্ছিলাম তখন । চোখের সামনে অনুফা দাঁড়িয়ে আছে ভেবে বিষম খেয়েছিলাম । অরণীর বাবা তখনও সামনে বসে । মেয়েকে আসতে দেখে উঠে দাঁড়ালেন । ভদ্রলোক যথেষ্ট অমায়িক । তিনি বললেন,"মায়ের ব্যাপারে সবই জানিয়েছি অরণীকে । তারপর থেকেই তার মামাকে ফোন করে খবর দেয়া হতো,আপনার ঠিকানা টা দেয়ার জন্য । কথা বলুন আপনারা । কিছু দরকার হলে বলবেন ।"

অরণী চুপচাপ বসে আছে । এতোক্ষণে ভালোভাবে খেয়াল করলাম, শাড়ি পরেছিলো অরণী । অনেক সেজেছেও । কোথাও বেড়াতে যাচ্ছিলো বোধহয় । আমিও কি করব বুঝে পেলাম না । চলে এলাম । অরণী তখনও সোফায় মূর্তির মতো বসে ।

আমি বাসায় ফিরে এলাম । কাল থেকে আবার সেই দশটা-পাঁচটা অফিস । বিকেলে গণ লাকড়ির চুলায় ধোঁয়া উঠিয়ে ভাত রান্না করা । চাকরি আর বেশি নেই । ইচ্ছা আছে,আবার রাজাপুরায় ফিরে যাওয়ার । অল্প কয়টা দিন অনুফার সাথেই কাটানো হোক । আজ ধোঁয়ায় চোখটা একটু বেশি ই জ্বলছে । ভাত রেঁধে আর কিছু করতে মন চাইলো না ।

অনুফার সাদা চিঠিগুলো বের করলাম । আজও দেখা হয়নি কি লেখা ওতে । আমি তো জেনেই গেছি ডায়েরী পড়ে । আর পানিতে ভিজিয়ে কি হবে । শুধু শুধু চিঠিগুলোই নষ্ট হবে ।

তাই আবার চিঠিগুলো যত্ন করে রেখে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম । আচ্ছা,অরণীর নামটা নীলন্তি থাকলেই বোধহয় বেশ হতো । মায়ের অংশটুকু মেয়ের মধ্যে পুরোপুরি বেঁচে থাকতো । এতোসব ভাবতে ভাবতেই একসময় ঘুমিয়ে পড়েন হাসান সাহেব ।

সকালে তার ঘুম ভাঙ্গে কড়া নাড়ার আওয়াজে । দরজা খুলেই আবার হাসান সাহেব চমকে উঠেছিলেন অরণীকে অনুফা ভেবে । মেয়েটা মিষ্টি করে হাসছে । দরজা খুলতেই অরণী বললো, "আসবো? "
হাসান সাহেব দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়াতেই অরণী এসে খাটের উপর বসে পড়লো । হাসান সাহেব একবার-দুবার দরজার ওপাশে উঁকি দিয়ে বললেন,"একলা এসেছো,মা ?"
অরণী হেসে বললো, "জ্বী । আজ কিন্তু আপনার ছুটি । আমি বাসায় বলে এসেছি সারাদিন আপনার সাথে থাকবো । আজ আপনি আপনার ইচ্ছা মত বাজার করবেন । আমি আপনাকে রান্না করে খাওয়াবো ।"
"এখানে এতো সুবিধা নেই তো । নিচে গিয়ে গণচুলায় রান্না করতে হয় । "
"হোক । সমস্যা নেই । আপনি বাজার করে আনুন । তারপর আমাকে দেখিয়ে দেবেন কোথায় রান্না করতে হবে ।"

হাসান সাহেব হাত-মুখ ধুয়ে বেরিয়ে পড়লেন । বাজার করে যখন ঘরে ফিরলেন,ততক্ষণে নিজের ঘরটাকে অরণী একেবারে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে ফেলেছে । নিজের রুম টা চিনতেই পারলেন না হাসান সাহেব । এখন তিনি মেয়েটার কাজ খুব মন দিয়ে দেখছেন । তিনি বাজার থেকে মুরগী কিনে এনেছেন । ভালো কিছু আনতে হবে ভাবলেই তার পোলাও-মুরগীর মাংসের কথা মনে হয় । কেনার পর মনে হয়েছে,মেয়েটা পারবে তো ? তাকে ভুল প্রমাণ করে অরণী খুব গুছিয়ে সব পরিষ্কার করে ফেললো । তারপর খুব যত্ন নিয়ে রেঁধেও ফেললো । অথচ, খেতে বসার সময় একটা প্লেটই বের করলো । হাসান সাহেব অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন,"তুমি খাবে না?"
অরণী বললো, "নাহ্‌ ,আজ আমি আপনাকে যত্ন করে পোলাও-মাংস বেড়ে খাওয়াবো ।"

অরণী দেখছে,হাসান সাহেব খাচ্ছেন । তার চোখের পানি প্লেটে পড়ছে টপটপ করে । অরণী বললো,"চাচা,মাকে যে সম্মান আপনি দিয়েছেন,তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ । মাকে আপনি বিয়ে না করলে মৃত্যুর আগে অসহ্য একটা যন্ত্রনা নিয়ে বেঁচে থাকতে হতো । আপনি তাকে সেই যন্ত্রনা থেকে মুক্তি দিয়েছেন ।"

হাসান সাহেব কি বলবেন ভেবে পেলেন না ।

অরণী বললো,"সেদিন আমার নাম অরণী শুনে আপনি খুব কষ্ট পেয়েছিলেন । আপনাকে বলা হয়নি আমার নাম কিন্তু নীলন্তিও । আমার বর্তমান মা আমাকে আদর করে নীলন্তি ডাকেন । বড়মামা মার মৃত্যুর পরপরই বাসায় আসেন । মামী নাকি মাকে জ্বরের ঘোরে প্রায়ই এই নাম প্রলাপ বকতে শুনতেন । তিনি আন্দাজ করে নিয়েছিলেন,নামটা হয়তো বা আমার জন্যেই। "

হাসান সাহেব হেসে নীলন্তির দিকে তাকান । মেয়েটা হাসছে,অথচ চোখভর্তি পানি । পৃথিবীতে এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর কটা আছে ?


- ফারহানা নিম্মী

1 comment: