Subscribe:

আঁধারের অরুন্ধতি-১ (অনুফার চিঠি)

১৩ ই ফেব্রুয়ারী,১৯৮২
সন্ধ্যা ৭ টা বেজে ৩০ মিনিট

নতুন ডায়েরীটাতে লেখা শুরু করেছি । নীল মলাটের ডায়েরী । পুরনো টার পৃষ্ঠা শেষ হয়ে গেছে । নতুনটায় লেখা শুরু করার আগে পুরনো টা পড়ে দেখছিলাম । প্রায় তিন বছরের দিনলিপি বাঁধা তাতে । ডায়েরী লেখার কতই না মজা । সবাই সব ভুলে যায় । আর আমি ডায়েরীকে সব মনে রাখতে বাধ্য করি ।


১৮ ই ফেব্রুয়ারী,১৯৮২
বিকেল ৫টা বেজে ৪৫ মিনিট

আজ বড়দা খুব বকেছেন । মিলিদের বাড়িতে মেহমান দেখতে গিয়েছিলাম বলে । ওর ভাইয়ার বন্ধুরা শহর থেকে বেড়াতে এসেছে । অনেকদিনের জন্য এসেছে । ওরা খুব নাকি জ্ঞানী মানুষ । আর মজার মজার সব কথা বলে । শুনতে গিয়েছিলাম শুধু । রাগের কি আছে অত ?

২ ই মার্চ,১৯৮২
রাত পৌনে ৯টা

অতুল দার সাথে আমার খুব ভাব হয়েছে । এতো মজা করে কথা বলেন উনি । দেখতে এতো সুন্দর কেন অতুলদা ? গাড় মেরুন ফ্রেমের মোটা কাঁচের চশমাটা এতো সুন্দর চোখগুলোকে আড়াল করতে পারেনি একটুও । উনি যখন চোখ বড় বড় করে কথা বলেন,আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি । এতো মায়া লাগে ।

৮ ই মার্চ,১৯৮২
সকাল ৮টা

কিছুক্ষণ আগে ডাকাতিয়া বিল থেকে ঘুরে এলাম । আমি,মিলি,স্বপনদা,অতুলদা আর স্বপনদার বাকী বন্ধুরা গিয়েছিলাম । নদীতীরে সুর্যোদয় দেখবো বলে । আমি আর অতুলদা আস্তে আস্তে হাঁটতে গিয়ে সবার পিছে পড়ে গেলাম । অতুলদা হাত নেড়ে গল্প করছিলেন । এক পর্যায়ে আমার কাছে জানতে চাইলেন, “অনুফা,তুমি রবীন্দ্র সংগীত পারো ?” খুব মন খারাপ হলো । আমি গান পারি না,তাতে কি ? শিখে নিতে কি খুব সময় লাগবে ?

১০ ই মার্চ,১৯৮২
সকাল ৮টা বেজে ৩০ মিনিট

খুব কান্না পাচ্ছে । অতুলদা কে নিয়ে এতো মিষ্টি একটা স্বপ্ন দেখলাম কেন ?

১২ ই মার্চ,১৯৮২
বিকেল ৪টা

মিলির কাছে শুনতে পেয়েছিলাম,অতুলদা ১৭ তারিখ চলে যাবেন । হঠাৎ মনে হলো পুরো পৃথীবি ফাঁকা হয়ে গেছে । পরদিন আস্তে করে ঘরের খিল খুলে বেরিয়ে এলাম । মিলিদের বাসায় যাব । গিয়ে দেখলাম,বিছানায় শুয়ে আছেন অতুলদা । খুব নাকি জ্বর । আমি পাশে বসতেই চমকে উঠলেন অতুলদা । আমায় বললেন, “মিলিরা তো নেই । বিবির হাটে মেলা বসেছে । সেখানে গিয়েছে । আমাকে ছাড়া যেতে চাচ্ছিলো না । আমিই জোর করে পাঠিয়ে দিয়েছি ।”
চাচাও ছিলেন না ঘরে । পুরো ঘরে আমি আর অতুলদা ছাড়া কেউ নেই । কোন দ্বিধা ছাড়াই আমি কপালে হাত রাখলাম । অতুলদা বললেন, “বাড়ি যাও,অনুফা ।”
আমি মাথার কাছে ঝুঁকে এসে বললাম, “আপনি কোথাও যেতে পারবেন না,অতুলদা । কোথাও না...”

১৪ই মার্চ,১৯৮২
সকাল ১১টা

আজ অতুলদার অনেক পছন্দের তেহারী রান্না করেছি । সকালে মিলিদের বাড়িতে গিয়েছিলাম দিয়ে আসতে । মিলি আমাকে দেখলেই মুচকি মুচকি হাসতে থাকে । ও কি জানে,আমি অতুলদাকে বড্ড ভালোবাসি ? কি জানি ? অতুলদা সবে গোসল সেরে এসেছিলেন বোধহয় । আমাকে দেখে চোখ নামিয়ে নিলেন । এতো লজ্জা কেন ছেলেটার ?

১৭ই মার্চ,১৯৮২
সন্ধ্যা ৭টা

আজ কিছু না জানিয়েই অতুলদা রা চলে গিয়েছেন । আমি দুপুরে গিয়ে দেখলাম বাড়িটা খাঁ খাঁ করছে । মিলিকে জিজ্ঞেস করতেই বললো, “তোকে না বললাম,অতুলদা রা আজ চলে যাবেন ? ভোরেই তো বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছেন ।”
আর কিছু শুনতে পাচ্ছি না । মাথাটা ভোঁতা লাগছে । ঘোরের মাঝেই জানতে চাইলাম, “অতুলদা আমাকে কিছু বলে জাননি ?”
মিলির উত্তর পাবার আগেই মাটিতে বসে পড়লাম । মিলি বাড়িতে নিয়ে আসতে চাইছিলো । আমি একলাই বাড়িতে ফিরেছি কাঁদতে কাঁদতে । ভাবী একটু পরপর রুমে উঁকি দিচ্ছেন,কিন্তু ভয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারছেন না ।

১৩ ইএপ্রিল,১৯৮২
সন্ধ্যা ৭টা

আজকাল কিছু লিখতে ভালো লাগে না । তোমায় দিলেম ছুটি...

২০শে মে,১৯৮২
রাত ৯টা

আমার মধ্যে কিছু একটা পরিবর্তন উপলব্ধি করতে পারছি । আজ বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম । ভাবী কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন ।

২৩ শে মে,১৯৮২
রাত ৮টা বেজে ৩০ মিনিট

আজ থেকে আবার লিখব । তোকে চিঠি লিখব । অতুলদা চলে যাওয়ার পর কতদিন অপেক্ষা করেছি একটা চিঠির জন্য । ভেবেছিলাম,অতুলদারও অনেক কথা বলা হয় নি বুঝি । আজকাল কারো জন্য অপেক্ষা করি না । এখন শুধু তোর কথা ভাবি । আচ্ছা অতুলদা থাকলে তোর কি নাম দিত,বলতো ? কাব্যিক মানুষ; অনেক ভারী নাম কপালে জুট্‌তো তোর ।

২৯ শে মে,১৯৮২
রাত ৯টা

আজ কয়েকদিন থেকেই “নীলন্তি” নামটা মাথায় ঘুরছে । তোর নাম দিলাম “নীলন্তি” ।

২রা জুন,১৯৮২
রাত ১০টা বেজে ৩০ মিনিট

নীলন্তি মা রে,আমি কি করব,বল ? বড়দা সেদিন গায়ে হাত তুলেছেন । বাবা-মা মারা যাওয়ার পর এই প্রথম গায়ে হাত তুলেছেন দাদা । তারপর সে কি কান্না তার । আমি কি এতোই খারাপ ? সবাই কেন আমাকে ভুল বোঝে ? আমার স্বপ্নে কখনো তো আমরা দুজন ছিলাম না শুধু । অতুলদা ও আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলো । আমি কি এতো খারাপ ?

৪ঠা জুন,১৯৮২
সন্ধ্যা ৭টা

বড়দা আমার সাথে কথা বলেন না । ভাবী এসে আমার ঘরে খাবার দিয়ে যায় । ঘরে থেকেও আমি নেই । ভালোই হয়েছে । আজকাল আলোতে চোখ জ্বালা করে । আমার আঁধারই ভালো । মা রে,তোকে বুকে নেয়ার জন্য প্রাণটা আকুলি-বিকুলি করে । তোর গায়ের ঘ্রাণ আমি এখনই পাই । অনেক ভালোবাসি তোকে । আজ বহুদিন পরে মায়ের কথা ভেবে কাঁদলাম ।

১৮ ই জুন,১৯৮২
দুপুর ২টা

প্রায়ই অসুস্থ থাকি । তোকে বহুদিন পর লিখতে বসলাম । আজকাল শুধু মনে হয়,বেশিদিন বাঁচবো না । কদিন আগে গা কাঁপিয়ে জ্বর এলো । আধো ঘুম-আধো জাগরণে দেখলাম দাদা পাশে বসে কাঁদছেন । আমার দাদাটা এতো ভালো কেন ?

২৯ শে জুন,১৯৮২
বেলা ১২ টা

সকালে বেশ জ্বর জ্বর লাগছিলো । এখন ভালো লাগছে । গতরাতে স্বপ্নে দেখলাম,তুই বেণী দুলিয়ে ছড়া বলছিস । তোর চোখজোড়া এতো পরিচিত লাগছিলো !


১১ই জুলাই,১৯৮২
দুপুর ২টা

ভাবী আজকাল সারাক্ষণ আমার ঘরে থাকেন । রাতেও আমার সাথে শুয়ে থাকেন । যদি কিছু দরকার হয় তাই । আমি জানি বড়দা ই ভাবীকে আমার সাথে এসে থাকতে বলেছেন । ভাবী জোঁকের মতন পিছে লেগে থাকেন । কদিন হল কিছু খেতে পারি না । প্রচন্ড খারাপ লাগে । মিলি এসেছিলো আজ । ভাবী দেখা করতে দেন নি আমার সাথে । অতুলদা কি কোন চিঠি দিয়েছেন আমাকে ?

২৩ শে আগস্ট,১৯৮২
সন্ধ্যাবেলা । সময় দেখা হয়নি । ঘরে ঘড়ি নেই ।

তুই কি অনেক চঞ্চল হবি ? আমার মতো ?

২রা সেপ্টেম্বর,১৯৮২
রাত ৮টা(আজকাল ঘর থেকে বেরোই না । ভাবী বলে গেছেন ।)

মার কথা আজ মনে পড়ছে অনেক । অনেক বেশি । আজকাল কিছু লিখতে পারি না । প্রচন্ড ক্লান্তি...

১৩ই নভেম্বর,১৯৮২
বেলা ২টা

তোকে আমি লিখে যাব । তাতে কি ,তুই নেই ? সবাই আমাকে ছেড়ে চলে যায় । তুই আগেও চোখের আড়াল ছিলি । এখনো তাই । তফাৎ শুধু এটুকুই আগে তোর বুকের ধুকপুকানি অনুভব করতাম । এখন আর করি না । কান পাতলেই গভীর শূন্যতা...

৩০ শে নভেম্বর,১৯৮২
সন্ধ্যা ৬টা

আজ বড়দা আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন । তিনি আমার বিয়ে দিতে চান । আমি মানা করিনি । বড়দার চোখের পানিকে উপেক্ষা করতে পারিনি বল্‌তে পারিস । তুই কি জানিস্‌ , আজকাল আমার প্রায়ই মনে হয়,তুই আমার আশেপাশেই কোথাও আছিস । কতবার তোর কান্নার আওয়াজে ভর দুপুরে দিশেহারা হয়ে তোকে খুঁজেছি ।

১৮ই ডিসেম্বর,১৯৮২
বিকেল ৫টা

আজ আজহার মুন্সী এসেছিলেন বাড়িতে । বাবা-মা মারা যাওয়ার পর প্রায়ই বাড়িতে আসেন তিনি । আমাদের খোঁজ-খবর নিয়ে যান । উঠোনের শুকনো কাপড় আনতে গিয়ে চাচার সামনে পড়েছি । চুল-দাঁড়িতে পাক ধরা বয়স্ক মানুষ । বয়সের ছাপ তেমন কাবু করতে পারেনি তাকে । চাচার হাসিতে শিশুসুলভ একটা সারল্য দেখেছি সবসময় । এরা বোধহয় সেই মানুষগুলোর মধ্যে,যাদের বয়স একটা সময়ে গিয়ে আটকে যায় ।

পহেলা জানুয়ারী,১৯৮৩
সকাল ১০ টা

দুপুরে আজহার চাচা তার ভাতিজা কে নিয়ে আমাকে দেখতে আসবেন । ভাবী আর ভাইয়া তা ই বলে গেছেন । প্রথমে অবাক হয়েছিলাম খুব । আমাকে বিয়ে করতে রাজী হয়েছে,সেই মানুষটাকে একবার দেখতে বড় ইচ্ছা হয় ।

পহেলা জানুয়ারী,১৯৮৩
রাত ৯ টা

মানুষটাকে দেখলাম । নামের মতই সাধারণ দেখতে । সাদা রঙের শার্ট ঘামে ভিজে জব্‌জব্‌ করছিলো । ভাবীর সাথে ঘরে ঢুকুতেই কেমন একটা ভয় ধরে গেলো মনে । অতুলদাকে অন্ধের মত বিশ্বাস করেছিলাম । অথচ আজ পরীক্ষা দিচ্ছি আমি । ছেলে পক্ষ আমাকে নাম্বার দেবে ? কত পেতে পারি ? দশে ছয় ? বিশ্বাসের পরীক্ষা আজীবন আমাদেরই কেবল দিতে হয় । কেন ?

৮ই জানুয়ারী ,১৯৮৩
সন্ধ্যা ৭ টা

কাল আমার বিয়ে । কোন উৎসব হবে না,কিছুই না । কাজী ডাকিয়ে “কবুল” বলা বিয়ে । ভাবী কিছু আগে বিয়ের শাড়ি,জরি ওড়না,সামান্য গয়না আর আলতা রেখে গেছেন ।

১০ ই জানুয়ারী ,১৯৮৩
সকাল ১১টা

অদ্ভুত ব্যাপার,জানিস ? মানুষটা রুমে ঢুকেই পাশ ফিরে শুয়ে পড়েছেন । আমি কত কথা বলবো বলে গুছিয়ে রেখেছিলাম । অনেক কিছু জানারও তো ছিলো ।

১৩ই জানুয়ারী ,১৯৮৩
বেলা ১২টা

আমার সাথে কোন কথা বলেনি এখনো মানুষটা ! অথচ সারাক্ষণ আমার আশেপাশেই থাকেন । কখনো কলম নেয়ার বাহানায় ঘরে আসেন,কখনো আফিফার সাথে কথা বলার বাহানায় । একবার বলেছিলাম, “আপনি কি আমাকে কিছু বলতে চান ?” লোকটা চমকে উঠে বললো, “কই, না তো...”
এরপর দ্রুত ঘর থেকে বেরুতে গিয়ে আরেকটু হলে তাল হারিয়ে পড়েই যাচ্ছিলেন ।

১৭ ই জানুয়ারী ,১৯৮৩
বিকেল ৪টা

প্রায়ই হাসান চোখের সামনে বই ধরে থাকতেন । ও তোকে তো বলাই হয় নি , মানুষটার নাম হাসান । সারাদিন কেবল পড়া আর পড়া । এতো কি লেখা থাকে ওতে ? আমি আর আফিফা খাটের উপর লুডু খেলতাম । আমি বেশ বুঝতে পারতাম,আমার জন্য পড়ায় মনোযোগ দিতে পারছেন না সে । বেচারা একটু পরপর আড়চোখে তাকাতো কেবল । কিছু বলতো না লজ্জায় ।

২০ শে জানুয়ারী ,১৯৮৩
রাত ৮টা

লোকটা আমাকে কিছুই জিজ্ঞেস করে না । কেন ?


২৭ শে জানুয়ারী ,১৯৮৩
সকাল ১১টা

শুনলাম সে ঢাকায় চলে যাবে । সামনে নাকি কি পরীক্ষা আছে । পরীক্ষার তো আরো একমাস বাকী । এতো তাড়াতাড়ি না গেলে কি হয় ? কি করব আমি এতো বড় বাড়িতে একা একা ? মানুষটার জন্য অদ্ভুত একটা টান অনুভব হয় । বিয়ের পর একবুক দুশ্চিন্তা নিয়ে এবাড়িতে এসেছিলাম । কিন্তু,অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম,বাড়িটাকে একটুও পর মনে হচ্ছে না । চাচা আমাকে মেয়ের মতো ভালোবাসতেন । ও তোকে বলা হয়নি,চাচার সাথে আমার একটা মিল আছে । চাচাও তার ভালোবাসার মানুষটিকে পাননি । যুদ্ধের সময় মিলিটারীরা ধরে নিয়ে গিয়েছিলো নাকি । এরপর আর বিয়েই করেননি তিনি ।

১৩ ই ফেব্রুয়ারী, ১৯৮৩
দুপুর ৩টা

আজ সকালে ঢাকায় চলে গেছে মানুষটা । খারাপ লাগছে খুব । বেশি লাগছে অবাক । মানুষের অনুভুতিগুলো এতো তাড়াতাড়ি বদলায় ?

১৪ই ফেব্রুয়ারী ,১৯৮৩
সকাল ১০ টা বেজে ৩০ মিনিট

আজ একটা মজা করতে ইচ্ছা করছে । মানুষটাকে চিঠি পাঠাবো । সাদা কাগজে সাবান দিয়ে লিখব । কাগজ পানিতে ভেজালেই যাতে লেখা ফুটে উঠে । প্রথমে সাদা কাগজ পেলে কি অবাক ই না হবে মানুষটা...পরে পানিতে ভেজালেই দেখতে পাবে,তাতে লেখা “আপনি এতো ভালো কেন ?” ভেবেই আনন্দ হচ্ছে ।

২০ শে ফেব্রুয়ারী,১৯৮৩
বিকাল ৫টা বেজে ৪৫ মিনিট

আজ মানুষটা চিঠি পাঠিয়েছে । কি অদ্ভুত ব্যাপার ...পুরো সাদা একটা কাগজ খামে ভরে পাঠিয়ে দিয়েছে । কিছুই বোঝেনি মানুষটা । মানুষটা তো আচ্ছা বোকা !

২৪ শে ফেব্রুয়ারী,১৯৮৩
রাত ৮টা

চিঠির আদান প্রদান চলছেই । সে এখনো খালি কাগজ পাঠাচ্ছে । কি অদ্ভুত !

১লা মার্চ,১৯৮৩
৬টা বেজে ৩০ মিনিট

আজ বিধান বাবু এসেছেন বাড়িতে । কদিন থেকেই থেকে থেকে জ্বর উঠছে । আফিফা চাচাকে বলে দিয়েছে । বড়চাচা সে কি বকা ! রাগ উঠলে চাচা এক কথা বারবার বলতে থাকেন । লোকটা একদম ছেলেমানুষ !

২রা মার্চ ,১৯৮৩
সকালবেলা

বিধানবাবু আজ আবার এসেছিলেন । চাচাকে কি যেন বলতেই চাচার মুখ কালো হয়ে গেলো । আমার কাছেও এসে বলছিলেন, “তুই দুঃশ্চিন্তা করিস্‌ না একদমই । তোকে ভালো ডাক্তার দেখাবো আমি ।” আমি চাচার কথা শুনে হেসে ফেললাম...

৪ঠা মার্চ ,১৯৮৩
রাত ৮ টা

শরীরের খুব দ্রুত অবনতি ঘটছে । আজকাল পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতেও পারি না । সারাক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকি । বড়দা আর ভাবী ও দেখতে এসেছিলেন । বিয়ের পর বড়দা আজই প্রথম আমার সাথে কথা বলেছেন । কি যে আনন্দ হচ্ছে !
সবাই আমাকে কত করে বললেন,হাসান কে জানাতে । আমি মানা করেছি । বেচারা হয়তো পরীক্ষা ছেড়েই চলে আসবে তাহলে । মা রে,আমার পৃথিবীটা খুব ছোট । এই ছোট পৃথিবীটার জন্য খুব মায়া হয় । মায়া হয় তোর জন্য,হাসানের জন্য,বড়চাচা,বড়দা,ভাবী,আফিফা সবার জন্য । আজ কয়েকদিন ধরে অতুলদার চেহারাটা মনে করার চেষ্টা করেও পারছি না । চেষ্টা করলেই হাসানের ছবিটাই আগে চোখে আসে । মানুষটার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে । এতো ভালোবাসার যোগ্য কি আমি আদৌ ছিলাম ?

১৫ ই মার্চ,১৯৮৩
সন্ধ্যা ৬টা

মা নীলু,আজকাল কিছুই লিখতে পারি না । আফিফা আমার জন্য ডায়েরীতে ছবি এঁকে দেয় । তুই থাকলেও কি তাই করতিস্‌ ?

এরপর আর কিছুই নেই । অরণী পাগলের মত পরের পৃষ্ঠাগুলো উল্টাতে থাকে । ওগুলোতে কাঁচা হাতের আঁকা ছবি ছাড়া আর কিছুই নেই । কোথাও কোথাও শুধু তারিখটা ই লেখা আছে । চশ্‌মার কাঁচে ধীরে ধীরে বাষ্প জমতে শুরু করেছে । আজ দুপুরেও সব ঠিক ছিলো । লোকটা আসার পরই পৃথিবী টা ওলট-পালট লাগছে । কেন এতো বছর পর তার সাথে দেখা হলো ? এক সময় তো অরণীও সব ভুলেও গিয়েছিলো । লোকটা এতোবছর পরে কেন মনে রেখেছে সবকিছু ?- ফারহানা নিম্মী

1 comment: