Subscribe:

না বলা ভালোবাসা

“বিশ্বাস করবে কিনা জানি না, যখন এ লেখাগুলো লিখছি, অঝোর ধারায় কাঁদছি আমি। কিন্তু আমি চাইনি কাঁদতে। কখনো ভাবিনি এভাবে হারিয়ে যাবো তোমাতে... কক্ষনো ভাবিনি আগে। কিন্তু ফান করে কথা বলতে বলতে কখন যে তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি, নিজেও বুঝতে পারিনি। জানি, অনেক রাগ করে আছো তুমি আমার উপর; রেগে থাকাই স্বাভাবিক। আমার যে আর কিছু করার ছিলোনা।


তোমাকে আমার জীবনের সাথে জড়িয়ে আর তোমার ব্যাথা বাড়াতে চাইনি। তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা এ আড়াই মাস এর প্রতিটি রাতে আমি কেঁদেছি। প্রতিটি ক্ষণে, প্রতিটি মূহুর্তে মনে পড়েছে তোমার সাথে রাতজেগে বলা প্রতিটি কথা। তোমার বউজান ডাক; শুধু কানে বাজে। সত্যি বলতে খুব ভালো লাগতো যখন বউজান বলে ডাক দিতে... এসব ভালোলাগার মাঝেই আমি বাধা পড়ে গিয়েছিলাম। হয়তো তুমি দেখতে সুন্দর না, কিন্তু তোমার মনটা খুব সুন্দর।
সেকথা থাক। আর তোমার মুল্যবান সময় নষ্ট করতে চাই না। ভালো থাকবে নাট-বল্টু।
ইতি
তোমার বউজান”

ভ্রু কুচকে এতক্ষন দীপ্রা’র পাঠানো মেসেজটা ফেইসবুকে দেখছিলো দ্বীপ। চিন্তাগুলো কেনো যেন তার সাথে প্রতারনা করছে। দীপ্রা সেই মেয়ে, যে মেয়ের সাথে তার চার মাসের ফ্লার্টেনোশিপ(রিলেশনশিপের ফ্লার্টিং পজিশন এটা)। এতোদিন তাহলে মেয়েটা তার সাথে ফ্লার্ট করেনি? সে একাই দিপ্রা’র সাথে ফ্লার্ট করে গিয়েছে? আর কিছু চিন্তা করতে পারছিলো না দ্বীপ।

ঘটনার সূত্রপাত একটা ফোন কল থেকে। ঠিক ছয় মাস তিন দিন আগের কথা।

দ্বীপ বিকেলবেলা বসে বসে আকাশ দেখছে, আর সেলফোনে গান শুনছে। হঠাৎ গানটা বন্ধ হয়ে গেল। মেজাজ খারাপ হয়ে গেল তার। মোবাইল ভাইব্রেট করছে, মানে কল এসেছে। অচেনা নম্বর। রিসিভ করে মোবাইল কানে দিতেই ভেসে এলো এক নারীকন্ঠ, যেটা দ্বীপের কাছে নতুন নয়।
-হ্যালো, দ্বীপ?
-হ্যা বলছি। কে?
-হব কেউ একজন। আস্তে আস্তে জানতে পারবে...
-কিন্তু আমি তো এখনি জানতে চাই। নতুবা আমি তো কথা বলবো না।
-কথা বলা না বলা তোমার ব্যাপার। ইচ্ছে করলে কথা বলতে পারো, ইচ্ছে না করলে কথা নাও বলতে পারো। আমি জোর করবো না। শুধু একটা প্রশ্ন করি?
-আচ্ছা করুন।
-কোন ইউনিভার্সিটি কোচিং এ ভর্তি হবা তুমি?
(এবার দ্বীপ বুঝতে পারে, এ মেয়ে তার পরিচিত কেউ একজন। স্রেফ মজা করার জন্যে তাকে কল দিয়েছে। আচ্ছা, তাহলে কথা বলা যায়। সে ঠিক করলো সে নিজেও মজা করবে।)
-হব একটায়। তুমি যেটায় হবা সেটায়।
-তুমি তো জানই না, আমি কে।
-আমি জানি তুমি আমার ফ্রেন্ড। তোমারে খুজে বের করতে আমার এক ঘন্টা সময় ও লাগবে না।
-হাঃ হাঃ হাঃ
(এই প্রথম মেয়েটা হাসলো। দ্বীপের কানে বারবার বাজতে লাগলো সেই হাসি। অনেক সুন্দর করে হাসে মেয়েটা)
-হাসলি কেন?
-এমনি। তোমাকে এক মাস সময় দিলাম, আমি কে সেটা খুজে বের করার জন্যে।
-আচ্ছা। চ্যালেঞ্জ এক্সেপ্টেড। ;)
-আমার উত্তরটা কিন্তু দিলা না। আচ্ছা, উত্তর লাগবে না। আমি এখন রাখি। পরে কথা হবে। তুমি এর মাঝে আমাকে খুঁজতে থাকো। বাই, ভালো থেকো।
-বাই।

ফোন রেখেই দ্বীপ প্রথমে ফোন করলো আনিকাকে। নম্বরটা দিয়ে বললো “নম্বরটা চিনিস? মেয়ের কত্ত বড় সাহস, আমাকে চ্যালেঞ্জ করে“ আনিকা জানিয়ে দিলো যে, ও এই নম্বর চিনে না। লাইন কেটে দিয়ে তানজিনাকে ফোন নম্বরটা দিয়ে বললো “দোস্তো, এই নাম্বারটা রাখ। তুই শুধু ফোন করে জিজ্ঞেস করবি, এর নাম কি। ভয় পাইসনা, এইটা একটা মেয়ের নাম্বার”। “কে এইটা?” তানজিনা পাল্টা প্রশ্ন করে। জবাব না দিয়েই ফোন কেটে দেয় দ্বীপ। এরপর ফোন দেয় মিমকে।
-তুই কি লুবাইনারে আমার নাম্বার দিছস?
-কি? আমার কি খায়া আর কাজ কাম নাই? তোর নাম্বার দিমু লুবাইনারে। যা ভাগ...

আর কিছু শোনার অপেক্ষা না করে লাইন কেটে দেয় দ্বীপ। ফোন দেয় অচেনা সেই মেয়েকে। নম্বর বন্ধ। চিন্তা ভাবনা গুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। মেয়েটা তার এয়ারটেল নম্বরে ফোন দিয়েছিলো। তার ফেইসবুকে শেয়ার করা আছে গ্রামীনফোন নম্বর। সুতরাং এ মেয়ে যে তার ফেইসবুক থেকে নাম্বার নিয়ে ফোন দেয়নি, এটা নিশ্চিত ।

দ্বীপ হেরে গিয়েছে চ্যালেঞ্জ এ। দুই মাস সতেরো দিন হয়ে গেছে। মেয়েটা কে, খুঁজে বের করতে পারেনি সে। মেয়েটার কথা একরকম ভুলেই গিয়েছে সে। ভর্তি পরীক্ষার চাপ ছিলো। সারাদিন বই এর মাঝেই ডুবে থাকত। অন্য কিছুর দিকে মনযোগ দেবার সময় কোথায় তার? কিন্তু এতো পড়েও ঢাকা ভার্সিটিতে চান্স মিললো না।

পরীক্ষা বাতিল ঘোষিত হলো। দীপ খুশি-ই হলো। আরেকবার চেষ্টা করা যাবে।

সন্ধায়বসে বসে এনালজি পড়ছিলো দ্বীপ। হঠাৎ বুঝলো মোবাইল ভাইব্রেট হচ্ছে। স্ক্রীনে ভেসে উঠছে unknown frnd calling… ফোন নাম্বারটা সেভ করে রেখেছিলো ও। চিনতে একটুও কষ্ট হলো না। রিসিভ করে কানে দিতেই হাসির শব্দ।
-কি হলো? হাসছো যে?
-হাসবো না তো কি করবো? এতোই পড়াশুনা করতেসো, ফোন ধরেও এনালজি আওড়াও। হিঃ হিঃ হিঃ
-তাই নাকি? খেয়াল করিনি। আচ্ছা, তুমি কে? দয়া করে বল। আমি চ্যালেঞ্জ এ হেরে গেছি, স্বীকার করছি।
-কি? এখনো চিনোনাই আমাকে?(অবাক হওয়া কন্ঠ) কষ্ট পেলাম(এবার বিদ্রুপ মেশানো কন্ঠ)
-নাহ। আসলেই চিনিনাই। এবার আপনি দয়া করে...

কথা শেষ হবার আগেই লাইন কেটে দেয় মেয়েটা। কয়েকবার ট্রাই করেও দেখলো দ্বীপ। প্রতিবারই বন্ধ পেলো নম্বরটা। কি আজব মেয়েরে বাবা! লাইন কাটতে দেরি হয়, ফোন বন্ধ করতে দেরি হয় না।

ঘুমানোর আগে ফেইসবুকে একবার ঢু মারা চাই-ই। ফেইসবুকে একটা স্ট্যাটাস দেয় ও “এক পেত্নি’র খোঁজে আছি”। তারপর ফ্রেন্ডদের সাথে চ্যাট করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে,দ্বীপ নিজেও জানে না। ঘুম ভাঙলো একটা ফোন কলে। “unknown frnd”। হাতঘড়িতে লাইট জ্বেলে সময় দেখল; ১টা ৫৩ বাজে। একরকম বিরক্তই হয় ও। সকাল সকাল উঠতে হবে, অথচ ঘুম ভাল না হলে মাথা ব্যাথা করে ওর। তবুও কল রিসিভ করে কানে দেয়। ঘুমাতুর কন্ঠে বলে “হ্যালো”, কিন্তু কথাটা জড়িয়ে যায়। অপর প্রান্ত থেকেই কথা আসে,
-ঘুমাচ্ছিলে? বিরক্ত করলাম?
-এই রাত ১টা ৫৪তে কি কেউ ঘুমায় নাকি? আমি তো কুতকুত খেলতেসিলাম।
-সরি দীপ। কথা বলতে মন চাইলো, তাই কিছু না ভেবেই তোমাকে কল করে বসলাম।
-আচ্ছা ঠিক আছে। ঘুম যখন ভাঙিয়ে দিয়েছো, তাহলে তোমার সাথে একটু কথা বলা যায়-ই। এখন আমার আর ঘুম আসবে না।
-ওহ...
-তোমার কি খবর, অচেনা পাখি?
-অচেনা পাখি? বাহ্, ভালো নাম দিসো তো।
-তাছাড়া আর কি করার? একটা নামে তো ডাকতেই হবে। তুমি তো তোমার নাম বলতেসই না।
-আচ্ছা, একটা ক্লু দেই। আমার নামের সাথে তোমার নামের কিছুটা মিল আছে।
-তাই নাকি? তোমার নাম কি দিপা? আমার তো দিপা নামের কোনো ফ্রেন্ড নেই।
-ভাবতে থাকো। আচ্ছা, তুমি নাকি কোন পেত্নি’র খোঁজে আছো? পেয়েছ ওকে?
-মানে? তুমি আমার ফেইসবুকের ফ্রেন্ডলিস্টে আছ! অই তুই কে রে?
-হাঃ হাঃ হাঃ... তুমি আমার সাথে তুই তোকারি শুরু করে দিলে?
-তুই আমার ফ্রেন্ড মানুষ। তোরে তুই কমু না তো কারে কমু? এখন ভালোমতন ক তুই কে?
-বলবো তো অবশ্যই। কিন্তু সময় হলে...
-সময় কবে আসবে? তুমি আমার জান্টু-মন্টু, তোমাকে তো বলবই...
-এগুলা কি বলো? (দ্বীপ আবার তুমি তে ফিরে গেসে)
-আরে, তোমাকে আদর করে ডাকলাম আর কি...
-ও...। তাইলে আমি তোমাকে কি বলে ডাকবো? তুমি আমার পুতুপুতু?
-আরে না। তুমি আমার নাট-বল্টু, আমি তোমার বউজান। হিঃ হিঃ হিঃ
-ধুর...
-হাঃ হাঃ... আচ্ছা, তুমি কি গান গাইতে পারো?
-না... তুমি পারো?
-হমম। এই গানটা শুনসো?
বলেই অচিন পাখিটা গান গাইতে আরম্ভ করলো...

“একটাই আমার তুমি কেনো বোঝোনা?
তুমি আমার... হৃদয়ের প্রাণপ্রতিমা...
একটাই আমি যে তোমার, চেয়ে দেখনা
আমি তোমার... রোদেলা দিনে শান্তছায়া
এ মন মন্দিরে, তুমি আমার প্রার্থনা
এ বদ্ধঘরে, তুমি দখিনা হাওয়া...”

মেয়েটার গানের গলা অসাধারন। গানের সুর-স্কেল কোথাও এততুকুও তারতম্য নেই। কখন যে অচেনা পাখিটা গান থামিয়েছে, দ্বীপ খেয়াল-ই করেনি।
-আমিতো একটা গান গাইলাম। এবার তোমাকেও গাইতে হবে।
-আমি গান পারিনা, বিশ্বাস করো।
-যাই পারো। গাও... অন্তত আমার জন্যে হলেও...
-আচ্ছা। কিন্তু শর্ত একটা। হাসতে পারবে না।
-কথা দিলাম, হাসবো না।

দ্বীপ গাইতে আরম্ভ করলো
“ভালোবাসার... আকাশ, এখানে অসীম নীল...
ডানা মেলে... উড়ে যায়, স্বপ্নের গাংচিল
স্নিগ্ধ সকাল... তার প্রতীক্ষায়
ক্লান্ত দুপুর... থমকে দাঁড়ায়...”

মেয়েটা চুপ করে শুনছিলো। এরপর দুইজন গান গাওয়ায় মেতে ওঠে। কথা-গানে কখন যে সকাল ছয়টা বেজে যায়, বুঝতেই পারে না দু’জনের কেউ...

এরপর থেকে প্রতিদিন-ই কথা হয় ওদের। তবে রাতের বেলা কথা, ওই এক দিন ই...

একদিন দুপুরে দীপকে কল দেয় অচিন পাখি। ও জিজ্ঞেস করে “আচ্ছা, মোবাইল থেকে বাংলা স্ট্যাটাস দাও কিভাবে?”। আমি বললাম “তোমার ই-মেইল এড্রেস দাও, আমি লিঙ্ক পাঠিয়ে দিচ্ছি”। আমার উদ্দেশ্য, ই-মেইল দিয়ে সার্চ করে ওর ফেইসবুক আইডি বের করা। “ই-মেইল বললে লিঙ্ক দিবা তো?” ও বললো। দ্বীপ বললো, “হ্যা, দিবো”। “ghum.pori**@yahoo.com” বললো অচিন পাখি। “তার মানে তুমি দীপ্রা? তোমার ফেইসবুক আইডি Ghum Pori? ইশশ, আগে কেনো যে মাথায় আসেনি। তুমি তো আমাদের ব্যাচ এর-ই। কিন্তু, আমার নাম্বার পেলে কোথায়? আমি তো তোমাকে কক্ষনোই আমার নাম্বার দেইনি।“ হঠাৎ কথা বলতে বলতে দীপ খেয়াল করলো, লাইন কেটে গিয়েছে...
এরপর আর কোনপ্রকার যোগাযোগ নেই দ্বীপ আর দীপ্রার মাঝে। না মোবাইলে, না ফেইসবুকে... হঠাৎ আড়াই মাস পর দীপ্রার মেসেজ পেয়ে দ্বীপ কি করবে তা বুঝে উঠতে পারলো না...


(এটা একটা কল্পিত ঘটনা। গল্প লিখার জন্যে কিছু পাচ্ছিলাম না, তাই এ কল্পনা। কারো জীবনের সাথে মিলে গেলে আন্তরিকভাবে দুঃখিত। ঘটনা বর্নিত করার জন্যই এ গল্প, তাই এতে কাব্যিকতার কোনো ঠাই নেই। অন্তত আমি দেইনি। বাস্তব জীবন কাব্যময় হয়না!
গল্পে দুটি গানের উল্লেখ রয়েছে। ১.ফুয়াদ এর “একটাই আমার তুমি” ২. “ভালবাসি তাই... ভালবেসে যাই’ টেলিফিল্ম এর শীর্ষসংগীত।)


-অক্ষরসৈনিক নিশাদ

1 comment: