Subscribe:

গন্তব্য

আমার বুকটা ধড়ফড় করছে। মাত্র ৫-৭ সেকেন্ডের ব্যাবধান. . . আর একটু হলেই বিনা পাসপোর্ট ভিসায় সোজা পৌছে যেতাম জাহান্নামের দরজায়। জাহান্নাম, কারন স্বর্গে যাওয়ার মত কোন পূণ্য আমি করেছি বলে মনে হয় নাহ !!


ইচ্ছা করছে একটা বড়সড় পাথর কুঁড়িয়ে নিয়ে কারটার হেডলাইট টা গুড়িয়ে দেই। মানুষ চোখ কপালে তুলে হাঁটে, আর এই গাড়িওয়ালারা হেড লাইট কপালে রেখে ঘোরাঘুরি করে। বড়োলোকের বখাটে ছেলেপেলের বেহেড কাজকর্ম আরকি।

যাক, আমি চাইলেও এদের কিছু করতে পারব না। আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছে নাকি ফাজিলটা? এক গাদা নোংরা পানি আমার গায়ে ছিটিয়ে নবাবের রথের মত চলে গেছেন। এখন এই নোংরা কাপড় নিয়েই পড়াতে যেতে হবে।

ধুর. . . . নতুন মাসটাই শুরু হয়েছে ফালতু ভাবে। মাসের আজ ৮ তারিখ। টিউশনির বেতন দেয়ার কোনো খবর নেই। আরেকটা ভালো টিউশনি পেলে এটা ছাড়তেই হবে। প্রতি মাসে এক ঝামেলা আর ভালো লাগেনা আমার।

আমার ছাত্রীর মা টাকে আমার মাঝে মাঝে মাথায় তুলে আছাড় দিতে ইচ্ছে করে। পুরোই জ্যান্ত একটা কার্টুনের চরিত্র। হিন্দী সিরিয়াল দেখে ওদের মত অঙ্গভঙ্গী করে। এই মহিলার জামাই তাকে সহ্য করে কিভাবে কে জানে!! আমার বউ হলে আমি হয় তাকে খুন করতাম, অথবা পাগল হয়ে রাস্তায় ট্রাফিক কন্ট্রোল করতাম এতোদিনে. . . . কি ভয়ঙ্কর বিরক্তিকর মহিলা। আমার যদি এই টিউশনির টাকায় পড়ার খরচ চালাতে না হত, আমি ঠিক তার গালে কষে দুটো চড় দিয়ে বের হয়ে আসতাম। যেসব ছেলেরা মেয়েদের গায়ে হাত তুলতে হয় না বলে চেঁচামেচি করে তাদের এই এলিয়েন কে দেখানো উচিত।

আমি ঢাকায় এসেছি আট মাস। এই আট মাসে এমন একটাও দিন যায়নি যেদিন আমার গ্রামে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করেনি। এই শহরের যান্ত্রিকতা আমার অসহ্য লাগে। মানুষ গুলো সব ভদ্রতার মুখোশ পড়ে থাকে। এই এতগুলো দিনেও আমি গা থেকে মাটির ঘ্রাণ দূর করতে পারিনি। আমার অবশ্য সে জন্য মোটেও আফসোস হয় না, বরং গর্ব হয় ভেবে। তবে আমি দেখেছি, আমি যখন আমার ক্লাসমেটদের বলি আমি একদম অজপাড়াগাঁ থেকে এসেছি, নাক কুঁচকায় অনেকে। আমি বেছে বেছে তাদের কাছ থেকে দূরে থাকি। এমন বন্ধু আমার না থাকলেও চলবে।

এত বাছ বিচারের পরও আমার কিছু প্রাণের বন্ধু আছে। অবশ্য বন্ধু না বলে এদের হনুমানের দল বলা যায়। কাজকর্ম দেখে মনে হয় সব কটার লেজে আগুন লেগেছে। যে কোনো মুহূর্তে লঙ্কা জ্বালিয়ে দিতে প্রস্তুত। সারাক্ষন নানা রকম ফন্দী ফিকির নিয়ে মহাব্যস্ত। যতক্ষন ওদের সাথে থাকি, জীবন যন্ত্রনাগুলো বেশ ভুলে থাকতে পারি। এই ইট পাথরের নগরে, এরাই আমার বেঁচে থাকার সহায়।

আসিফ, তূর্য, দীপু, মাহিন আর আমি সৈকত। এই হল আমাদের বীর হনুমান সেনা. . . আমাদের দীপুর অবশ্য হনুমান ছাড়াও আরেকটা উপাধি আছে। সে হল প্রেমিক পুরুষ। সারাদিন সাদিয়া, মানে তার প্রেমিকা, মানে হনুমান বাহিনীর একমাত্র ভাবীর সাথে মোবাইলে গুজুর গুজুর করে। আমরা বাকী চারটা ওকে রোজ ক্ষেপাই। বলি 'কানে ঘা হয়ে যাবে রে হনুমান, মোবাইল রাখ।'

আবার মনে মনে হিংসে করি। এই কপোত কপোতির ভালোবাসাময় দিনরাত্রি দেখে ভাবি, এমন একটা জীবন হলে মন্দ হত না. . . .

বাড়ি থেকে চিঠি এসেছে, মায়ের চিঠি। চারদিন ধরে শার্টের পকেটে নিয়ে ঘুরছি। খাম খুলে চিঠিটা পড়তে ভয় লাগছে। আমার বাবা নেই। মা আর ছোট বোনটাকে ফেলে এসেছি গাঁয়ে। আমি চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই, আমার বোনটা না খেয়ে কলেজে যাচ্ছে। মায়ের শাড়ির ছেঁড়া অংশটা আরো বড় হয়েছে। চিঠিটায় হয়ত আরো বড় কোন দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছে। হয়ত বোনের কলেজ টা ছেড়েই দিতে হল। হয়ত আমাদের দুধেলা গাভীটার মৃত্যু. . .

আমি কাপুরুষ ধরনের মানুষ। এই একটা দুঃসংবাদ সহ্য করার শক্তিও আমার নেই। গত কটা দিন পাগলের মত আরেকটা টিউশনি খুঁজছি। এ মাসে মাকে একটা টাকাও পাঠাতে পারিনি। যতক্ষন চিঠির মুখটা বন্ধ থাকবে হয়তো একটা মিথ্যে আশা থাকবে, সব কিছু ঠিক আছে। এই নিশ্চয়তাটাই বা কম কী. . . .

এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে গেছি, টেরও পাইনি। ঘুম ভাঙল আসিফের গালিতে। ফাজিলটার মুখে গালির তুবড়ি ফুটছে। ভালোভাবে চোখ কচলে দেখি ও একা না, সব কটা রুদ্রমূর্তি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ভেবেই পেলাম না, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আমি কি এমন করলাম যে সবগুলো এত ক্ষেপে গেছে !!

আমাকে প্রায় ধরে বেঁধে কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছে। হলের গেটে এসে দেখি সাদিয়া দাড়িয়ে আছে। আমার চোখ কপালে উঠে গেল। যে মেয়েকে সন্ধা সাতটায় তার হল থেকে বের করতে দীপুর জান বের হয়ে যায়, সে এই নিশুতি রাতে ব্যাগ হাতে এখানে কেন !!!

আমি এখন বাসে বসে আছি। বাস যাচ্ছে আমার গাঁয়। আমি একা না, আমরা পাঁচ হনুমান আর একজন মমতাময়ী মহিলা হনুমান একসাথে যাচ্ছি।

ঘটনার পটভূমি হল মায়ের দেয়া চিঠিটা। আমি ওটা হাতে নিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মাহিন আমাকে খেতে ডাকতে এসে চিঠিটা পেয়ে নিজের সম্পত্তি ভেবে খুলে ফেলেছে।

মায়ের এবারের চিঠিতে কোনো দুঃসংবাদ ছিলো না। আমার আদরের ছোট বোনটার বিয়ে ঠিক হয়েছে। গ্রামের স্কুলের একজন শিক্ষক তার আকাশের মত বিশাল মনটা নিয়ে আমাদের পাগলিটাকে আপন করে নিতে চায় সব জেনেশুনেই। আর একদিন গেলেই আমি বিয়েটা মিস করে ফেলতাম. . . .

এই হনুমান সেনা এক ঘন্টার মধ্যে কি মায়ামন্ত্র বলে আমার বোনটার পরিবার হয়ে গেছে। তূর্যটা তার ল্যাপটপ কেনার জন্য জমানো টাকাগুলো সব আমার হাতে দিয়ে আমাকে একটা চড় মেরে বলল 'তোর বোন কি আমার বোন না, শালা?'

পিকনিকে যাবে বলে টাকা জমাচ্ছিলো সবাই মিলে। সেই টাকায় বোনের বিয়ের এক একটা জিনিস কিনেছে ওরা। সাদিয়া যে কত ভালো শপিং করতে পারে তা আমি জিনিসগুলো দেখে বুঝলাম।

আমাদের বাসটা ঢাকার সীমানা ছেড়ে যাচ্ছে। চোখ ভর্তি পানি নিয়ে আমি এই প্রথম বার শহরটার জন্য মায়া অনুভব করছি। যে শহরে আমি আমার ভালোবাসার মানুষগুলোকে খুঁজে পেয়েছি, তাকে মায়া না করে উপায় আছে?


-তৃপ্ত সুপ্ত

2 comments: